প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ১০:৪৮ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ ডিসেম্বর ২, ২০২৫, ১:৩৫ পি.এম
নিকলীতে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল ঘিরে সীমাহীন অভিযোগ সেবা প্রত্যাশীদের

জামশেদ ইবনে মুসলিমঃ নিকলীতে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল হলেও সেবার মানে অসন্তোষ প্রকাশ করে চলেছেন স্থানীয় সেবা প্রত্যাশীরা। দীর্ঘ সময় থেকেই সীমাহীন অভিযোগে ঘেরা এ হাসপাতাল। জনবল সংকট থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামাদির পাশাপাশি দায়িত্বে থাকাদের অবহেলা এবং নিষ্ঠুরতা তথ্য উপাত্ত উঠে আসে সরেজমিনে।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলা সদরের মীরহাটির জুবায়েরের ২ বছরের শিশু উজাইফার ২০ নভেম্বর রাতে হঠাৎ ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হয়। রাত আনুমানিক ১ টার দিকে হাসপাতালে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক একটি প্রেসক্রিপশন হাতে ধরিয়ে দেন। জ্বর থামাতে হাসপাতালে নূন্যতম ঔষধ না পেয়ে মনে মনে ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। রাতে আশেপাশের সকল ডিসপেন্সারিও বন্ধ। তার অভিযোগ এ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ঔষধ মিলে না।
নিকলী উপজেলা সদরের বানিয়া হাটি এলাকার রফিকুল নামের এক ডায়বেটিস কার্ডধারী রোগী গত ৭ সেপ্টেম্বরে সকালর দিকে স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সজিব ঘোষের কাছে নূন্যতম ঔষধের আবদার করে। আবদানে ব্যর্থ হলে হাসপাতালের ঔষধ কার জন্যে? এ প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে ডাঃ সজিব ঘোষ ক্ষিপ্ত হয়ে প্রেসক্রিপশন ছিঁড়ে ফেলে। এক পর্যায়ে লাঞ্ছিত করে উল্টো সাজানো মামলায় হাজতেও প্রেরণ করে। ভোক্রভোগী রোগীর অসহায় বিধবা মাতা বিচারের লক্ষ্যে থানাতে অভিযোগ দেয়। সেখানে ব্যর্থ হলে এক পর্যায়ে আদালতে মামলা দায়ের করে। এ ঘটনায় এলাকাবাসী বিচারের দাবিতে মানববন্ধনও করে।
নিকলী সদর উপজেলার পাঁচরুখী এলাকার আলাল উদ্দিন নামের এক বয়োবৃদ্ধ কৃষক গত ১৮ নভেম্বর রাত প্রায় ৮ টার দিকে তার বাড়ির সামনে সড়ক দূর্ঘটনায় পতিত হন। চিকিৎসার লক্ষ্যে তাকে দ্রুত নিকলী সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক রোগীর অবস্থা বেগতিক দেখলে স্বজনদেরকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে পরামর্শ প্রদান করে। এই সময়ে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার লক্ষ্যে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হলেও চালক না থাকায় সিএনজি যোগে নেওয়ার পথে সময় ও সেবার ভোগান্তির শিকারে রাস্তাতেই রোগীর মৃত্যু। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি অবসরে চলে গেছেন চালক। অসংখ্য সেবা প্রত্যাশীর অভিযোগ সেখানে সহজে মিলে না অ্যাম্বুলেন্স সেবাও।
২১৪.৩৯ বর্গকিলোমিটারের অতি প্রাচীন নিকলীর সেই জনপদের বসতিদের অধিকাংশরাই দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। কেটে খাওয়া ও দিনমজুর শ্রেণীর মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক অধিকাংশ। ঘনবসতিপূর্ণ অনুন্নত এই এলাকায় সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে তেমন একটা সুযোগ মিলেনি মৌলিক মানবিক চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ উন্নত স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রেও। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিকলী উপজেলা সদরের ষাটধার এলাকাতে ১৯৮৩ সালের প্রথমদিকে ভারত চন্দ্র সাহা নামের এক ব্যক্তি ডিসপেনসারি হিসাবেই স্থানীয়দের উদ্দেশ্যে একটি স্বাস্থ্যসেবা চালু করে। পরে ১৯৮৩ সালে থানা হিসেবে স্বীকৃতির পরবর্তীতে এর কার্যক্রম শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে হাসপাতালে রূপান্তরিত হয়। এই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় রোগীদের সার্বিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে হাসপাতালটিকে ২০০৮ সালের প্রথম দিকে ৩১শষ্যায় রূপান্তরিত কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে ২০২৩ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে এবং ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দের প্রথমের দিকে এটিকে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে পৃথক ভবনে পরিণত করে। অথচ স্থানীয়দের ক্ষোভের ভাষ্য, ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও সেখানে এখনো মিলেনি কাঙ্খিত সেবা কার্যক্রম।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গাইনি ডাক্তার না থাকায় সেখানে এখনো মিলেনি প্রসূতিসেবা কার্যক্রম। শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারতো বহু দূরের কথা সেখানে ডাক্তার সোহাগ মিয়া, ডাক্তার হুমায়ুন কবির, ডাঃ তানজিনা আফরিন ও ডাঃ শরিফ, ডাঃ তানজিনা আফরিন, ডাঃ পরাগসহ স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সজীব ঘোষকে দিয়েই চলে হাসপাতালটি। সেখানে ডেন্টাল ডাক্তার থাকলেও কার্যক্রম নেই বললেই চলে। টেকনোলজিস্টের অভাবে বন্ধ সয়ে আছে এক্সরে মেশিনও।
ইতিপূর্বে উর্ধ্বতনদের আগমনের পাশাপাশি বহু রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশের দিকে কার্যকরী পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়ে গেলেও মিলেনি ফলপ্রসূ উন্নয়ন। ১০ অক্টোবর স্বাস্থ্য সচিবের আগমন উপলক্ষে আশাবাদী মান উন্নয়নের লক্ষ্যে।
জরুরী রোগীদের ক্ষেত্রে অভিযোগের চিত্র অনেকখানি ব্যতিক্রমী হয়ে উঠার অন্যতম কারণ হলো রাস্তার প্রসস্থ কম এবং খানাখন্দের ভোগান্তি। হাওরের অবহেলিত মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি জনস্বার্থে হাসপাতাল ও সেখানকার রাস্তার দিকে নজর দেয়া হলেই সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে সহায়ক হবে।
ডাঃ সজিব ঘোষের কাছে অ্যাম্বুলেন্সের সমস্যার কারণ এবং রোগী মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে প্রশ্ন রাখতেই, মৃত্যু ঘটনার খরব তার জানা নেই বলে উল্লেখ করেন। তবে চালক আরজুর কয়েকদিন আগে অবসরে গেছেন বলে স্বীকার করেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে আনীত অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে সদা বিপরীত মুখী তথ্য তুলে ধরে। তাছাড়াও সেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে চেষ্টার কোনো কমতি নেই বলেও জানান।
হাসপাতাল পরিদর্শনের সময়ে স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমানও আশ্বস্ত করে গেছেন ‘হাওরের এই হাসপাতালের ডাক্তার নিয়োগ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়ন বিষয়ে।
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৫