প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে লাভের মুখ দেখে
আলি জামশেদ ও নুরুজ্জামান মামুনঃ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৯ সালে একমাত্র লাভের মুখ দেখে ভারী এই শিল্প প্রতিষ্ঠানটি । সেখানকার সংসদ সদস্যের ভাষ্য, স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে ৬ মে, মিলটির বর্তমান বাস্তবতা স্পষ্ট করতে ঘটনাস্থলে যাবেন। শিল্প সচিবের পিওর ভাষ্য, পর্যায়ক্রমে বন্ধ সকল চিনিকলের কার্যক্রম শুরু হবে। কিশোরগঞ্জের এই চিনিকলের বিষয়েও খতিয়ে দেখা হবে।
৩৫০ একর ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার গভর্নর আবদুল মোনেম খানের উদ্যোগে আর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে শত একর ভূমির উপর নির্মিত কালিয়াচাপড়া চিনিকল। ময়মনসিংহ বিভাগের এই ঐতিহাসিক ভারী এই শিল্প প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের ১১টি চিনিকলের মধ্যে তৎকালীন ১টি। শুধুমাত্র শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৮-৭৯ অর্থবছরে একবার লাভের মুখ দেখে প্রতিষ্ঠানটি। আজ বিলুপ্ত এই চিনিকল। অকেজো এই চিনিকলে জড়িয়ে রয়েছে নানা ট্রাজেডি। উজান ভাটির কিশোরগঞ্জের এই ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠানটি এক সময়ে কালিয়াচাপড়াসহ জেলার নিকলী-বাজিতপুরসহ আশেপাশের স্থানীয়দের স্বপ্নের বিষয়বস্তু ছিলো। সেখানকার অসংখ্য কর্মচারীরাও কাজ করতেন সেখানে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে ১৯৯৬৫ সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৮ সালে একাধিক শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ স্থানীয় এক শ্রমিক নেতার মাধ্যমে ১২৫০ জন শ্রমিক নিয়ে এর উৎপাদন কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে একের পর লসের মুখ দেখলে সরকার নিটল টাটার কাছে ২০০৪ সালে সেটি বিক্রি করে দেন। নিটল টাটাও শর্ত ভঙ্গ করে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শুরু করে।
কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি ও পাকুন্দিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী কালিয়াচাপড়া চিনিকল দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় শত শত একর মূল্যবান জমি কার্যত অকেজো হয়ে পড়ে আছে। সম্ভাবনাময় এ ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালুর দাবিতে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা ক্রমেই বাড়ছে।
জানা যায়, ১৯৬৫ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আবদুল মোনেম খানের আমলে প্রায় সাড়ে তিনশত একর জমি অধিগ্রহণ করে কটিয়াদি উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়ন ও পাকুন্দিয়া উপজেলার পাটুয়াভাঙ্গা ইউনিয়নের অংশবিশেষে “কালিয়াচাপড়া চিনিকল” প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৬৮ সালে শ্রমিক নেতা কোবাদ মিয়ার নেতৃত্বে প্রায় ১,২৫০ জন শ্রমিক নিয়ে মিলটির উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়। ময়মনসিংহের নান্দাইল, নরসিংদীর মনোহরদীসহ কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলা মিলিয়ে মোট ১৬টি আখ সংগ্রহ কেন্দ্রের মাধ্যমে কাঁচামাল সরবরাহ করা হতো।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সরকার মিলটির দায়িত্ব গ্রহণ করে পরিচালনা অব্যাহত রাখে। মিলকে ঘিরে গড়ে ওঠে স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নের লক্ষ্যে হাট বাজার। প্রতি মঙ্গলবার কালিয়াচাপড়ায় বসত গরুর হাট। ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কালিয়াচাপড়া চিনিকল উচ্চ বিদ্যালয়। সে সময় অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত মৌসুমে কৃষকরা গরুর গাড়ি, মহিষের গাড়ি ও ট্রাকের মাধ্যমে আখ সরবরাহ করতেন। গচিহাটা রেলস্টেশন থেকে প্রায় সাড়ে আট কিলোমিটার রেলপথে উৎপাদিত চিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হতো। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। উন্নত জাতের বোরো ধান চাষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় দীর্ঘমেয়াদি আখ চাষে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন স্থানীয় কৃষকরা। পাশাপাশি বিল পরিশোধে বিলম্ব, শ্রমিক সংকটসহ নানা সমস্যার কারণে মিলটি লোকসানে পড়তে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালে তৎকালীন সরকার মিলটি লে-অফের মাধ্যমে বন্ধ ঘোষণা করে।
পরবর্তীতে ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে নিটল-টাটা গ্রুপের কাছে মিলটি শুধুমাত্র চিনি উৎপাদনের শর্তে বেসরকারি পরিচালনায় লক্ষ্যে বিক্রি করে দেয় সরকার। তারা দীর্ঘ ৪ বছর আখ ও কাঁচামাল ব্যবহার করে চিনি উৎপাদন চালালেও ২০০৯ সালে পুনরায় উৎপাদন বন্ধ করে দেয় লসের দিক বিবেচনায়। এরপর শর্ত ভঙ্গ করে বিভিন্ন সময়ে ট্রাক উৎপাদন, গার্মেন্টস ও ড্রাইভিং স্কুল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোও স্থায়ী হয়নি। বর্তমানে মিলের কিছু জমি বিক্রি হয়ে গেছে এবং অবশিষ্ট এলাকায় সীমিতসংখ্যক কর্মচারী দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, একজন ইনচার্জ ও একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তাসহ প্রায় ৩০-৪০ জন কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। এদিকে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার দেশের বিভিন্ন জেলায় ইপিজেড স্থাপনের ঘোষণা দিলে কিশোরগঞ্জও এর অন্তর্ভুক্ত হয়। এ প্রেক্ষিতে কালিয়াচাপড়া চিনিকলের জায়গায় “কিশোরগঞ্জ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন” স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
কালিয়াচাপড়া মিলের প্রবীণ কর্মকর্তা আব্দুল মান্নানের সাথে কথা হলে তিনি আফসোসে মিলের স্মৃতিচারণায় দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। এক পর্যায়ে তিনি ১৯৭৬ সালে যোগদান পরবর্তীতে ৭ জুলাই ১৯৯৪ সালে মিলটি বন্ধ হলে অবসরে যান। তার দেয়া তথ্যমতে, ১৯৬৫ সালে পূর্ব বাংলার গভর্নর আবদুল মোমেন খানের পাশাপাশি তৎকালীন কেন্দ্রীয় আওয়ামীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং কিশোরগঞ্জ মহকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুল হামিদ ও সৈয়দ জামানসহ অসংখ্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তখন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চেষ্টা করেন। তার দেয়া তথ্যমতে, ১৯৯৩ সালে ১৪১জন ফিল্ড অফিসার আর প্রায় ৬০০ শ্রমিক থাকা অবস্থায় লে-আউট হয়।
এছাড়াও নিকলী সদরের কুর্শা এলাকার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি প্রয়াত ওবাইদুল হকের স্বজনসহ কুর্শা এলাকার গুদাম রক্ষক প্রয়াত আঃ কাদিরের স্বজনদের সাথে কথা হলে তারা সেখানকার চাকরি হারানোর কারণ ও সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির মূল কাঠামো কাজে লাগিয়ে পুনরায় উৎপাদন চালু করা হোক। এ দাবিতে তারা মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছেন। তাদের মতে, মিলটি চালু হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি ফিরে আসবে।
বর্তমান সরকার দেশের বিভিন্ন বন্ধ কলকারখানা চালুর উদ্যোগ নিলেও কালিয়াচাপড়া চিনিকল পুনরুজ্জীবনের বিষয়ে এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
মিলটি নতুন করে চালু হলে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় উন্নয়নের গতিও ত্বরান্বিত হবে। আঁখ চাষে কৃষকদের প্রণোদনা দেয়া হলে বাড়বে আবারও আঁখের আবাদ।
সংসদীয় আসন ১৬৩, কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী পাকুন্দিয়া) সংসদ সদস্য এ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিনের সাথে কথা হলে তিনি এক কথায় উল্লেখ করেন, এই মিলটির অনেক ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে।
জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে একমাত্র লাভের মুখ দেখ ছিলো। তিনি ১৯৭৮ সালের মে মাসে মিলটি পরিদর্শনে আসেন। সে সময়ে সেখানকার অডিটরিয়াম, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সহায়তা করেন বলে জানান। এ মিল সম্পর্কে স্থানীয়দের দাবিদাওয়ার করা শোনার লক্ষ্যে ৬ এপ্রিল মিল স্কুলের সামনের মাঠে সভায় উপস্থিত থাকার কথা জানান। পাশাপাশি মিলের মালিকানা এখনো সরকার নাকি অন্য কেউ সেই ধুম্রজালের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যেও কথা বলবেন বলেও জানান। এছাড়াও ভালো কিছু করতে চাইলে সরাসরি তার সহযোগীতার অবস্থান স্পষ্ট করবেন বলে আশ্বস্ত করেন।
কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি এবং ও বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলমকে বিকালে একাধিকবার ফোন করা হলেও মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর পিএস মো. জুনায়েদের সাথে যোগাযোগ করা মন্ত্রণালয়ের একটি জরুরী মিটিংয়ে মন্ত্রীর ব্যাস্ততার কথা জানান।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ ওবায়দুর রহমানের সাথে টেলিফোনের ০২৪৭১২০৮০০ নম্বরে কথা হলে সচিবের (পিও) পরিচয়ে জানান, পর্যাক্রমে দেশের সকল বন্ধ শিল্প কারখানা পুনরায় চালুর বিষয়ে কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কিশোরগঞ্জের সুগার মিলের জটিলতার বিষয়সহ বাস্তবতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হলে এই বিষয়ে লিখিত আকারে জানালে সঠিক জবাব দিতে পারবেন বলে জানান।