নিরাপত্তার প্রশ্নে সংখ্যালঘুসহ আ’লীগ ও সাধারণের নিবর ভোটে জয়ের সম্ভাবনা কিশোরগঞ্জ -৫ আসনে
বিশেষ প্রতিবেদনঃ কিশোরগঞ্জ-৫ আসনটিতে নির্বাচন তুলনামূলক অধিক জমজমাট হয়ে উঠেছে। ভোটের লক্ষ্যে একের পর এক কেন্দ্রীয় ও প্রবাসী নেতাদের আগমনের দৃশ্য। প্রার্থীসহ নেতাকর্মীরাও দিচ্ছেন নানান প্রতিশ্রুতি আর দেখাচ্ছেন প্রলোভন।
সরেজমিনে দেখা মিলে আসনটিতে ভোটের নেশায় সেখানকার প্রার্থী ও নেতারা নানান ধরনের প্রতিশ্রুতিতে মত্ত রয়েছেন। প্রার্থী পক্ষের মাঝে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের দৃশ্যও উঠে আসে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমেরিকার জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ৪ বারের সিনেটর শেখ মুজাহিদুর রহমান ওরফে চন্দনকেও ভোটের ভোট চাইতে দেখা গেছে। এ সিনেটর তাঁর ছোট ভাই বিএনপির কেন্দ্রীয় বহিষ্কৃত নেতা শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের পক্ষে ৭ ফেব্রুয়ারিতে ঐতিহাসিক ডাক বাংলা মাঠের এক নির্বাচনী সমাবেশের মধ্যে দিয়ে মঞ্চে উঠে বক্তব্য দেন। এক পর্যায়ে সেখানে তাঁকে বলতে শোনা গেছে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নয় বরং এলাকার লোক হিসেবে তার ভাইয়ের পক্ষে সাপোর্ট করতে এসেছেন। এ নিয়েও একটি মহলের রয়েছে অভিযোগ। নির্বাচনকে প্রভাবিত করতেই সিনেটরসহ একাধিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের এই ধরনের পদচারণা বলে গুঞ্জন উঠেছে।
এছাড়াও জামায়তের পক্ষে জেলার সকল প্রার্থীর জন্যে ভোট চাইতে কটিয়াদীর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আসেন ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর আমির ডা.শফিকুর রহমান। সমাবেশ শেষে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময়ে কিশোরগঞ্জ -৫, আসনের জামায়াত প্রার্থীর সমর্থক নিকলীর ছাতিরচরের সালাম (৬০) চলন্ত বাসের ধাক্কায় মৃত্যু বরণও করে।
সর্বশেষ তথ্যে উঠে আসে বাজিতপুর ঐতিহাসিক ডাক বাংলার মাঠে ৮ ফেব্রুয়ারি সকালের দিকেও বাংলাদেশ ইসলামীর ছাত্র শিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম ও ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও সদ্য জামায়াতে যোগদানকৃত মেজর (অবঃ) আক্তারুজ্জামান রঞ্জন, এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আহনাফ সাঈদ খান, বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিশের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা মোহাম্মদ আলী, খেলাফতে মজলিশ কিশোরগঞ্জ জেলা সভাপতি মাওলানা আব্দুল আহাদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির কিশোরগঞ্জ জেলা সেক্রেটারী আব্দুল্লাহ আল মামুন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির কিশোরগঞ্জ জেলা সভাপতি হাসান আল মামুনসহ অসংখ্য নেতাকর্মী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীর অধ্যাপক রমজান আলীর পক্ষে ইনসাফের রাষ্ট্র কায়েম করতে ভোটের প্রার্থনা করেন। সেই সাথে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমালোচনাও করেন।
তাছাড়াও কিশোরগঞ্জের ভৈরবে গত ২২ জানুয়ারি রাতের পদযাত্রা ও পথসভার মধ্যে দিয়েই বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আগমন ঘটে। আগমন পরবর্তীতে স্থানীয় ভোটের মাঠের পরিবর্তন অনেকাংশে লক্ষণীয়। জেলার ছয়টি আসনের বিএনপি প্রার্থীকে জয়ের লক্ষ্যে এবং এলাকার উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করতে ধানের শীষের পক্ষেও ভোট চান তিনি।
পাশাপাশি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বায়ক হিমেল ও স্থানীয় উপজেলা বিএনপির সভাপতি বদরুল মোমেন মিঠু, সাধারণ সম্পাদক হেলিম তালুকদার, বাজিতপুর উপজেলার বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র এহসান কুফিয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মামুন, ও জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি এড. শাহ আলম ও বিএনপি নেতা বদরুল আলম শিপুসহ অসংখ্য নেতাকর্মী সৈয়দ এহসানুল হুদার পক্ষে ধানের শীষের বিজয়ের লক্ষ্যে প্রাণপণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অপরদিকে বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতিও সেখানকার সেক্রেটারিসহ দুই উপজেলাতে একাধিক কেন্দ্রীয় নেতাসহ দুই ধাপে ৩১ জনের পরে আবারো ৮ তারিখ পর্যন্ত ছাত্রদল, যুবদলদল, কৃষকদল, তাতীদলসহ পর্যায়ক্রমে মোট প্রায় ৭০ জনকে তাদের দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বহিষ্কার করেছেন বলে স্থানীয় বিএনপি সূত্র জানায়। পাশাপাশি অতীতের বহিস্কারকৃত নেতাকর্মীকেও বহিস্কারাদেশ তুলে নিতে দেখা গেছে। এ বহিস্কারের মধ্যে দিয়েই বিজয়ের দ্বার উন্মুক্ত করেছেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন দলটির কর্মী ও সমর্থকরা।
আসনটিতে মোট প্রার্থীর সংখ্যা ৮ জন। এদের মধ্যে ধানের শীষ, দাড়িপাল্লায়, হাঁস, হরিণ, হাত-পাখা, লাঙ্গল, মোমবাতি ও হারিকেন প্রতীক রয়েছে। স্থানীয় ভোটারদের অভিমত ভোট যুদ্ধ হবে প্রধানত ধানের শীষ, দাড়িপাল্লা ও হাঁস প্রতীক ঘিরেই।
বিভিন্ন জরিপে উঠে আসে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের ধানের শীষ প্রতীক প্রার্থীকে ঘিরে জয়ের সম্ভাবনা অনেকাংশে বেশি। যতই দিন এগুচ্ছে ধানের শীষের প্রতীকের প্রার্থীর জনমত ততটাই বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যান্য প্রার্থী পক্ষের লোকেরাও ধানের শীষের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে নানাবিধ কারণে। তারেক রহমানের পরিকল্পনাকে (প্লান) বাস্তবায়ন করতে এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতেই বিএনপির প্রতি ঝুঁকছে তরুণ ভোটারও। নিয়মের মধ্যে দিয়েই সকল প্রকারের নির্বাচনী প্রচার প্রচারণাও সেই বাস্তবতা জানান দিচ্ছে। এছাড়াও স্বতন্ত্র এক প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে টাকার ছড়াছড়ির বিষয়ে। গুঞ্জন উঠেছে অনেকের বিবেকও টাকার কাছে জিন্মি হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত বিবেকের তাড়নায় সতন্ত্র প্রার্থীর কাছ থেকে টাকা নিলেও এই এলাকার উন্নয়ন ও পারিপার্শ্বিক স্বস্তির দিক বিবেচনায় ধানের শীষের পক্ষেই ভোট কেন্দ্রে ভোট দিবেন বলেও অভিমত ধানের শীষের প্রার্থী ও তার পক্ষের লোকদের। নানামুখী হুমকি ধামকির কথাও উঠে আসে বিক্ষিপ্ত স্থানে। একাধিক জরিপে উঠে আসে নিকলী-বাজিতপুরে সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৫৭ হাজার। এরি মধ্যে অধিকাংশই আওয়ামীগের ভোটার বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়। আওয়ামীলীগের নেতৃস্থানীয় ভোটারেরা কেন্দ্র যাবেন কি-না এটা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে অধিকাংশ ভোটারেরা আগ্রহের সহিত কেন্দ্র যাবেন বলেই নানা দিক থেকে ইঙ্গিত মিলছে। তবে সেক্ষেত্রে কে, কি প্রতীকে ভোট দিবে এটা এখনো স্পষ্ট করেননি। আসনটিতে ধারণা করা হচ্ছে বিএনপির ভোটের একাংশের ভাগাভাগি হবে। তবে সেক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর ফিক্সড ভোট রয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলছে। সব দিক বিবেচনায় ত্রিমুখী ভোট যুদ্ধে মধ্যে দিয়ে আওয়ামীগের নিরব ভোটই কারো পক্ষে ঘটাতে পারে বিল্পব। সেক্ষেত্রে যার কাছে ভোটারেরা নিরাপদ মনে করবে তিনিই হবেন নিকলী বাজিতপুরের কর্ণধার।
নির্বাচনী আনন্দ উল্লাসের মধ্যেও জানা গেছে, নিকলীর একাধিক স্থানে একাধিক প্রার্থী পক্ষের কাছ থেকে গত ৩ ফেব্রুয়ারিতে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ দেখিয়ে ধানের শীষ ও হাঁসের সমর্থককে ৫ হাজার করে মোট ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন সেখানকার এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট প্রতীক দত্ত। এ নিয়েও রয়েছে ব্যাপক আলোচনা। তবুও সেখানকার তৃণমূলে উত্তাল ভোটের মাঠ। যার বিন্দুমাত্রও দেড় যুগে উপভোগ করতে পারেননি স্থানীয় ভোটারেরা।
উজান ভাটির অত্র জেলার হাওর অধ্যুষিত পর্যটন নিকলী ও সেখানকার প্রাচীন পৌরসভা নিয়ে গঠিত বাজিতপুর উপজেলার বুক চষে বেড়াচ্ছেন অসংখ্য নেতাকর্মীরা ভোটের লক্ষ্যে। ভোটারদেরকে নানান ধরনের উন্নয়নের স্বপ্নও দেখাচ্ছেন অনেকেই। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের আফসোসের ভাষ্য, অনেক প্রার্থীকে নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিতে দেখা গেলেও নির্বাচন শেষে তাদের মুঠোফোনে পর্যন্ত পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। বর্তমানে কাউকে কাউকে নগদ অর্থের প্রলোভন এবং ভবিষ্যৎ লোভের মোহে আবদ্ধ করে নিতেও দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তা উঠে আসে। এ আসনে মোট ভোটারের সংখ্যা ৩ লক্ষ ৫৩ হাজার ৫৬৬ জন। এরি মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ১ লক্ষ ৮২ হাজার ৪৫২ জন। নারী ভোটারের সংখ্যা ১ লক্ষ ৭১ হাজার ১০৮জন। বাকী ৬ জন হিজরা ভোটার। তন্মধ্যে নিকলীতে ভোটারের সংখ্যা ১ লক্ষ ২৮ হাজার ৫৯ জন। সেক্ষেত্রে নিকলীতে পোস্টাল, আইসিভি, ওসিভিসহ ১২শ’ ৩০টি ভোট রয়েছে। বাজিতপুরের ক্ষেত্রেও সেই অনুপাতেই রয়েছে বলে জানা গেছে স্থানীয় নির্বাচনী অফিস সূত্রে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে স্বাধীনতা পরবর্তী এ আসনটিতে অধিকাংশ সময়েই বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকে। যে কারণে এটি বিএনপির দূর্গ বলেও পরিচিত। ফ্যাসিবাদী কৌশল ছাড়াও এ আসনটি বিএনপির অধীনেই ছিলো বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এবারও বিএনপির জয়ের প্রায় শতভাগ সম্ভবনা। তবে এই পর্যন্ত জয়ের মুখ দেখেননি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলসহ কোনো ধরণের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। শুরুর দিকে দিকে জামায়তে ইসলামীর প্রতিদ্বন্দ্বীতার কথা অধিক পরিমাণে উঠে আসলেও দিন শেষে পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসলামী আন্দোলনের নিকলী উপজেলার বাসিন্দা হাত-পাখা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন। তবুও জামায়াতের জেলা আমির ও কেন্দ্রীয় সুরা সদস্য অধ্যাপক রমজান আলী স্বপ্ন দেখছেন সঠিকভাবে ভোট হলে দাঁড়িপাল্লা মার্কায় তিনিই এবার জয়লাভ করবেন।
সতন্ত্র প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমানও স্বপ্ন দেখছেন তিনিই বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন। তার কর্মী সমর্থকদের দাবি বহিস্কারে পরও তাদের জয় ঠেকানো অনেকটা অসম্ভব হবে।
ধানের প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদাও নিশ্চিত জয়ের স্বপ্ন দেখছেন দেশের উন্নয়ন করতে হলে বিএনপির বিকল্প নেই আর নিকলী-বাজিতপুরের মানুষ নিরাপদে থাকার আশায় নিশ্চিত তাঁকেই ভোট দিবেন। তারেক রহমানের স্বপ্নকে ১২ ফেব্রুয়ারিতে তাঁর মাধ্যমেই পূর্ণ করবেন ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করে।
কিশোরগঞ্জ -৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনের অধিক জনপ্রিয় প্রতিটি প্রার্থীই তাঁদের নিজেস্ব অভিমত নানাভাবে ব্যক্ত করে চলেছেন জয়ের সম্ভাবনার দিক উল্লেখ করে। জয়ের লক্ষ্যে প্রত্যেকেই স্বপ্ন দেখছেন নিজেস্ব ভাবনা থেকে।