নিজেস্ব প্রতিবেদনঃ গরীবের জন্যে বরাদ্দকৃত ত্রানের দুম্বার মাংস উপজেলা প্রশাসন ও ইউপি সদস্যদের ঘরে। দায়িত্বে থাকারা তথ্য গোপনে ব্যস্ত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে মরিয়া। তাদের দেয়া তথ্যেও দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এমন অনিয়ম শুধু নিকলী উপজেলাতেই নয় বরং আশেপাশের একাধিক উপজেলাতেও অনিয়মের তথ্য মিলে।
সৌদি আরব সরকারের অনুদান হিসেবে দুস্থ, অসহায় ও এতিমদের জন্য পাঠানো দুম্বার গোশত নিয়ে কিশোরগঞ্জের নিকলীর পুরো উপজেলা জুড়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ। গুঞ্জন উঠেছে বরাদ্দকৃত এসব মাংস হতদরিদ্র, দুস্থ এবং এতিম-অসহায়ের মধ্যে বিতরণের পরিবর্তে উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা পরিষদের কর্মকতা-কর্মচারী এবং ইউপি সদস্যরাই নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন।
জানা গেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মাধ্যমে গত বুধবার (৫ নভেম্বর) সৌদি সরকারের পাঠানো মোট ২৯ কার্টন দুম্বার মাংস আসে নিকলী উপজেলাতে। প্রতি কার্টনের ভেতরে বড় সাইজের প্যাকেটে ৮ কেজি মাংস আর বড় প্যাকেটের অভ্যন্তরেও থাকে ছোট সাইজের ৩ কেজি ওজনের প্যাকেট। নির্দেশনা ছিলো এসব মাংস উপজেলার দরিদ্র, অসহায় ও দুস্থ মানুষের মাঝে বিতরণ করতে হবে। কিন্তু স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বরাদ্দ আসার পর তা সঠিকভাবে বিতরন করা হয়নি।
নিকলী উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, গরীব অসহায় এতিমদের মাঝে বিতরনের লক্ষ্যে ২৯ প্যাকেট মাংস উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের মাঝে বিতরন করা হয়। উপজেলার সাতটি ইউনিয়েনর মধ্যে নিকলী সদরে ইউনিয়নের পাঁচ প্যাকেট ও বাকি ছয়টি ইউনিয়নের চার প্যাকেট করে বিতরন করা হয়।
উপজেলা বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ে, সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, যে সকল অসহায়ের নামে চালিয়ে দেয়া হয়েছে প্রকৃতপক্ষে তারা পাননি। সেখানকার দায়িত্বে থাকা পিআইও বলছেন তিনি অবগত নন আর ইউএনও বলছেন তার মাধ্যমেই ২৯ প্যাকেট বন্টন হয়েছে।
নিকলী উপজেলা সদরের পেন্যাল চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির এক প্রশ্নের জবাবে ২৯ প্যাকেজ পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। প্রতি প্যাকেটে আনুমানিক আড়াই থেকে ৩ কেজি হবে বলেও জানান। এসব মাংস তিনি সদর মহর কোনার নূরে মদিনা, সদর পশ্চিম কুর্শা গ্রামের তাহমিনা আইডি এতিম মাদ্রাসাসহ একাধিক মাদ্রাসায় দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। সরেজমিনে আলতাফ নিসা আইডিয়াল আলীম ও কুর্শা আদর্শ এতিমখানার পরিচালক রফিকুল ইসলাম রুবেল বলেন, অত্র প্রতিষ্ঠানে কোনো দুম্বার গোশত দেওয়া হয়নি। তবে সুপার মো. দেওয়ান আলী বলেন, আনুমানিক ৪০০ শিক্ষার্থীদের মাঝে ১কেজি গোশত দেওয়া হয়েছে। অসংখ্য শিক্ষার্থীরা বলেন, দুম্বার মাংস খাওয়াতো দূরের কথা এ সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না। বন্টনের দায়িত্বে থাকাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে এতিমখানা ও মাদ্রাসায় খোঁজ নিলে ব্যতিক্রমী তথ্যচিত্রই উঠে আসে।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “সন্ধ্যার পর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে কয়েকজন কর্মকর্তা এসে মাংসের কার্টনগুলো ভাগ করে নেন। অল্প কিছু মাংস স্থানীয় একটি মাদ্রাসা ও এতিমখানার এতিম শিশুদের নামে নিলেও বেশিরভাগ মাংসই কর্মকর্তারা নিজেদের বাড়িতে নিয়ে গেছেন।
প্রতিবন্ধী জেসমিনের অসহায় বিধবা মাতা ক্ষোভের ভাষায় বলেন, তিনি গরিব মানুষ, ঈদের পর থেকে অনেকদিন ধরে মুখে মাংস দিতে পারেননি। সরকার থেকে মাংস এসেছে বলে শুধু শুনেছেন! এক টুকরো মাংসও তিনি পাননি বলে উল্লেখ করেন।
নিকলী সদর ৪নং ওয়ার্ডের প্রতিবন্ধী তারেক জানান, শুধু শুনি প্রতি বছর বিদেশ থেকে দুম্বার মাংস আসে। দুম্বার মাংসের খবরতো সব সময় বড়লোকেরাই আগে খবর পায়, তারাই এসব নেয়, আমরা চোখেও দেখি নাই।
নিকলী উপজেলা সদরের ৮নং ওয়ার্ডের মেম্বার আনিসুজ্জামান মোহন সত্যতা স্বীকার করে বলেন, তিনি এবং সদর ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম দুইজনে মিলে মাত্র এক প্যাকেট পেয়েছেন। যা বন্টনের ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
নিকলীর উপজেলার ছাতিরচর ইউনিয়নের সামসুজ্জামান চৌধুরীর ওরফে ইয়ার খান এক প্রশ্নের জবাবে ৩টি ছেঁড়া প্যাকেট পেয়েছেন বলে জানান।
নিকলী উপজেলার একাধিক ইউনিয়নের অসংখ্য সাধারণ মানুষের সাথে এই বিষয়ে কথা হলে তারা জানান, সৌদি সরকারের মানবিক সহায়তা তাদের জন্য পাঠানো হলেও এ বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না।
অসংখ্য স্থানীয়ের অভিযোগ, সরকারি অনুদান বণ্টনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করায় এমন অনিয়মের ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটে থাকে। শুধু মাংস বন্টনের ক্ষেত্রে নয় বরং নানান কিছুতেই। তারা বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন।
নিকলী উপজেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা (পিআইও) মো. দেলোয়ার হোসেনকে চলতি বছরের দুম্বার মাংস সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তার কিছুই জানা নেই বলে উল্লেখ করেন। এছাড়াও এক পর্যায়ে তাকে প্রশ্ন করা হয় গরীবের দুম্বার মাংস আপনি বস্তাবন্দি করে নিজের বাসায় নিয়ে গেছেন? জবাবে এমন তথ্য সঠিক নয় বলেও উল্লেখ করেন। এছাড়াও এক পর্যায়ে এগুলো গরিবের হক গরীব পাবেন উল্লেখ করলেও উপজেলা প্রশাসনের অন্যদের দিকে ইঙ্গিত করেন।
নিকলী থানার অফিসার ইনচার্জ কাজী আরিফ উদ্দিন জানান, দুম্বার মাংসের বিষয়ে নিকলী উপজেলার পিআইও দেলোয়ার হোসেন ফোন করে জানান, থানার জন্যে মাংস রাখা হয়েছে। অথচ পরে আর কোনো খবর নেননি। থানায় কোনো মাংস পৌছেনি।
নিকলী উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা রেহেনা মজুমদার মুক্তির সাথে কথা হলে, তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন, নিকলী উপজেলার জন্যে ২৯ প্যাকেট দুম্বার গোশত দেওয়া হয়েছে। এগুলো সাধারণত ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অধীনে বন্টন হয়ে থাকে। তাছাড়া সকল চেয়ারম্যানদেরকে ৪ প্যাকেট করে আর সদরের চেয়ারম্যানকে ৫ প্যাকেট দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র এতিম অসহায়দের মাঝে বন্টনের লক্ষ্যেই। প্রতি প্যাকেটে ৮ কেজি করে অথাৎ ২৩২ কেজি গোশত বিতরণ করা হয়েছে। এই বিষয়ে অনিয়মের কোনো অভিযোগ তার কাছে নেই। সেক্ষেত্রে বন্টনে অনিয়ম হলে তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন এবং আইনগ ব্যবস্থা নিবেন বলেও উল্লেখ করেন।
কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ফৌজিয়া খানের সাথে দুম্বার গোশত বিতরণ প্রসঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জবাবে এসব মাংস একমাত্র দুস্থ অসহায়ের জন্যে দেওয়া হয়ে থাকে বলে উল্লেখ করেন। এছাড়াও বন্টন বিষয়ে অনিয়ম প্রসঙ্গে কথা হলে স্থানীয় চেয়ারম্যান মেম্বারের মাধ্যমে এতিমখানা ও মাদ্রাসায় বন্টন করে দেয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন। বন্টনে অনিয়মের অভিযোগ তার কাছে পৌছেনি বলেও জানান। এছাড়াও এ সম্পর্কে অধিক তথ্য জানতে চাইলে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের অধীনস্থরা পুরোপুরি তথ্য দিতে পারবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।