ছবিঃ বাজিতপুর পাটুলীঘাট ও পৌর এলাকার ফায়ার সার্ভিস সংলগ্ন রাস্তার
বিশেষ প্রতিবেদনঃ বৃহত্তর ময়মনসিংহের অতি প্রাচীন বাজিতপুর পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ একাধিক স্থানে দীর্ঘ ২০ বছরেও উন্নয়নমূলক কাজ হয়নি। ১৮৬৯ সালে স্থাপিত এই পৌর সভার পৌর মেয়রও অপরাধের দায় মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এ নিয়ে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মাথাব্যথা না থাকলেও ফ্যাসিবাদী আওয়ামীগের অসাধুদের ন্যায় স্মরণীয় ৫ আগষ্টের পর থেকে বিএনপির হতাকর্তাদের একাংশের নেতা-কর্মীরাও চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত রয়েছেন। বিপুল পরিমাণে টাকার মালিক বনে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এমন আলোচনায় সরব বাজিতপুরের তৃণমূলে।
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার হাওরের প্রবেশদ্বার বলে খ্যাত গুরুত্বপূর্ণ সেই উপজেলার শেষ সীমানতের দীঘিরপাড় খেয়া ঘাটকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে দীর্ঘদিন থেকেই। জানা গেছে বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির দু’গ্রুপের নেতৃত্বে থাকাদের দলীয় কোন্দলের কারণেই অনেকটা ঢাকঢাক গুড়গুড় থেকে দিবালোকের মতো প্রকাশ পেয়েছে নিবর চাঁদাবাজি ঘটনা। এমন অসংখ্য নিবর চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটলেও ধামাচাপা পড়ে আছে। স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে নানাবিধ প্রশ্ন। এছাড়াও গুঞ্জন রয়েছে নিকলী বাজিতপুরের দলীয় গ্রুপিং চরমে থাকায় সুবিধা নিচ্ছে সেখানকার ফ্যাসিস্টরাও। ফ্যাসিবাদীদেরকেও সুবিধা দিয়ে অর্থনৈতিক সুবিধাসহ নানামুখী ফায়দা লুটে চলেছেন অসাধু রাজনৈতিক মহলের একটি চক্র। এমনকি প্রশাসনের সাথে জড়িত অসাধুরাও।
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও বর্তমান সদস্য হুমাইপুরের কাইয়ুম খান হেলাল ও বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির দুইজনই প্রভাবশালী নেতা। ওরা একে অন্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ তুলে ধরে বাস্তবতার নিরিখে দীর্ঘদিন ধরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উপস্থাপন করে চলেছেন নানান মহলে। এমনকি মানববন্ধনের মধ্যে দিয়েও এক নেতাকে চাঁদাবাজিসহ নানামুখী অভিযোগের তথ্য তুলে ধরতে দেখা গেছে।
বাজিতপুর উপজেলার অন্তর্গত বর্ষায় বদ্বীপ একটি এলাকার নাম হুমাইপুর। প্রায় ২১ হাজারের অধিক জনগণের বসতি এই গ্রামে। সকলকেই খেয়া ও ফেরি পারাপার হয়ে নিজ উপজেলা, জেলাসহ দেশে বিভিন্ন স্থানে আসা যাওয়া করতে হয়। এছাড়া শুকনো মৌসুমেও নদী পারাপারের বিকল্প উপায় থাকে না সেখানকার বসতিদের। এ খেয়াঘাটটি শুধু স্থানীয় এবং বাজিতপুরবাসীর পারাপারের জন্যে নয় বরং শুকনো মৌসুমেও হাওরের ফসল আনা নেওয়া থেকে শুরু করে পাশ্ববর্তী উপজেলার অষ্টগ্রাম এবং আশেপাশের উপজেলা ও জেলার অসংখ্য লোকেরা সময় বাঁচাতে এ রাস্তাকে বেচে নন। সব দিক বিবেচনায় হাওর বাসীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌ পথ এটি।
২০২৫ সালে গুরুত্বপূর্ণ এই পাটুলি ঘাট ইজারা নেন ইঞ্জিনিয়ার জহির নামের এক ব্যক্তি। যদিও তার সাথে এই বিষয়ে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে জানা গেছে চলতি বছর প্রায় ৫২ লাখ টাকার বিনিময়ে ইজারা নেয়া হয়েছে। বিগত সময়ে ফ্যাসিস্টদের সিন্ডিকেট বানিজ্যের কবলে দীর্ঘ সময়ব্যাপী ৬ লাখ টাকার বিনিময়েই ছিলো। তবে আগে ৩০০ টাকা করে প্রতি নৌকা থেকে ভাড়া নিলেও বর্তমানে ৬০০ টাকা করে নেয়া হচ্ছে। জানা গেছে ২০টির অধিক নৌকা পাটুলী ঘাট থেকে নিয়মিত ছেড়ে যাওয়া হচ্ছে। বর্ষাকালে চারদিকের সকল নৌকাই উন্মুক্ত থাকে। সেক্ষেত্রে জনপ্রতি পারাপারের বিষয়েও পূর্বের ১০ টাকার পরিবর্তে ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সাধারণ জনগণ ও নৌ মাঝিদের ভাষ্যমতে, একদিকে নৌমাঝিরা যেমন দলীয় গ্রূপিং ও চাঁদাবাজির কারণে নিরবে বলির পাঁঠার ন্যায় জুলুমের শিকার হচ্ছে অপরদিকে সাধারণ জনগণ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। এতদ্বসত্ত্বেও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে নারাজ স্থানীয়রা। তবে নৌ মাঝিরা নানাবিধ কারণে নিবর চাঁদাবাজির শিকার হলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করে চলেছেন মূলত ঝামেলা এড়িয়ে চলার লক্ষ্যে। অসংখ্য নৌ মাঝির ভাষ্যমতে, মূলত নেতারা চাঁদাবাজির করায় অন্যের মাধ্যমে। নেতারা থাকে অধরায়। তবে ভাগবাটোয়ারার দ্বন্দ্ব হলেই শুধু তা প্রকাশিত হয় বলে উল্লেখ করেন। নৌ মাঝি হিসেবে তারাই যেনো বলির পাঁঠা। প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে সত্য বললে নৌকা নিয়ে ঠিকে থাকা কঠিন হবে বলেও ইঙ্গিত করেন।
বাজিতপুরে শুধু নৌপথে দুর্ভোগ নয় দলীয় অপরাজনীতির কারণে ২০ বছরের কাছাকাছি সময় ধরে কুলিয়ারচর থেকে সোজা সুজি সময় বাঁচানোর সেই খন্দকার কান্দি-নিতারকান্দির গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাতে উন্নয়নমূলক কাজ নেই। বঙ্গবন্ধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের এলাকার সেই ১ কিলোমিটারের কাছাকাছি রাস্তার বেহাল দশার কারণে চরম ভোগান্তিতে চালক, পথচারী ও বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীরা। বৃষ্টির সময়ে গাড়ির চাকার মাধ্যমে গর্তের নোংরা কাদাপানিতে জামাকাপড় নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়াও পৌর এলাকার পরিবার পরিকল্পনা স্বাস্থ্য কেন্দ্রও সেই রাস্তা ঘেঁষেই। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে নেতা ও আমালাদের যেনো এ দিকে নজর নেই!
বাজিতপুর উপজেলার হিলোচিয়া ইউনিয়নের স্পষ্টবাদী যুবক জুলফিকার আহমেদ মারভিন জানান, বাজিতপুরে অনেকেই নিরব চাঁদাবাজির শিকার। অসাধু নেতাদের টাকা দিয়ে সুবিধা নিচ্ছেন অনেকেই। চাঁদার বিনিময়ে অবৈধভাবে বালি ভরাটের ঘটনায় গণমাধ্যমে সত্য ঘটনার বাস্তবতা তুলে ধরার কারণে বাজিতপুর থানাতে ৬ অক্টোবরে এক সাজানো মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়াও ক্ষোভের ভাষায় যুক্তি তুলে ধরে তাকে আরও বলতে শোনা গেছে ‘প্রতিদিন ৫০ হাজার টাকা বিএনপির নেতাদেরকে চাঁদা দিয়ে বালি ভরাট হচ্ছে’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই ভিডিও ভাইরাল। তবুও এ সবের বিরুদ্ধে আইনি কোনো হস্তক্ষেপের দৃশ্য প্রসাশনের পক্ষ থেকে মিলেনি! অথচ প্রমাণ সাপেক্ষে সত্য কথা বলার কারণে স্থানীয় বিএনপির ভাগবাটোয়ারার দ্বন্দ্বের পাশাপাশি স্বার্থে আঘাতের কারণে উল্টো হয়রানি করা হচ্ছ!
নৌপথে কাইয়ুম খান হেলালের বিরুদ্ধে মনিরুজ্জামানের আনিত চাঁদাবাজির অভিযোগের বাস্তবতা সম্পর্কে জবাবে হেলাল অসংখ্য তথ্য প্রমাণ তুলে ধরে বলেন, ৫ আগষ্টের পর এমন কোনো সেক্টর নাই যেখান থেকে মনির মিয়া অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন না। এছাড়াও গত ৭ এবং ৮ তারিখের ১০টি নৌকা আটক করে চাঁদাবাজির মূল হিসেবে নেপথ্যে নায়ক মনিরকেই উল্লেখ করেন। বাজিতপুরের মনির একটি আতঙ্কিত নাম। এমন ইঙ্গিতের পাশাপাশি পানিবন্দী এখানকার মানুষের অসহায়ত্বের কথাও তুলে ধরেন। তবে ৬০০ টাকা দিতে যেখানে অসহায় নৌ মাঝিরা হিমসিম খায় সেখানে তার বিরুদ্ধে উদ্ভট ২ হাজার টাকা করে চাঁদার অভিযোগকে সাজানো নাটক বলেও যুক্তি দেখান। এছাড়াও তিনি এটাকে শ্বাক দিয়ে মাছ ঢাকার সামিল বলে অভিহিত করেছেন।
বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনিরকে ঘিরেও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং এসবের পুরোপুরি বাস্তবতা জানার লক্ষ্যে একাধিকবার ফোন করা হলেও ফোন রিসিভ করে সালিশ বৈঠকের ব্যস্ত রয়েছেন বলে উল্লেখ করেন এবং ফ্রি হয়ে ফোন দিবেন বলে জানান।