আলি জামশেদঃ কিশোরগঞ্জের নিকলীর হাওরভিত্তিক পর্যটন এলাকায় আবারও গোসল করতে নেমে এক পর্যটক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। নিখোঁজের প্রায় ২৪ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও শনিবার বিকেল পর্যন্ত তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অন্যান্য পর্যটক ও স্থানীয়দের মধ্যে আবারো উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
নিখোঁজ পর্যটককে উদ্ধারে স্থানীয় নৌ-পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ডুবুরি দল, ট্যুরিস্ট পুলিশ, স্থানীয় থানা পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সদস্যরা যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করছেন।
জানা গেছে, শুক্রবার (১০ জুলাই ২০২৬) দুপুরে উপজেলার দামপাড়া ইউনিয়নের কাঁঠালিয়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিখোঁজ ব্যক্তি গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার কান্দানিয়া গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে শফিকুল ইসলাম তুলু (২৮)।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বন্ধুদের সঙ্গে নৌকা ভ্রমণে নিকলী হাওরে আসেন শফিকুল। দুপুর আনুমানিক ১টা ৪৫ মিনিট থেকে ২টার মধ্যে তিনি কাঁঠালিয়া এলাকায় হাওরের পানিতে গোসলের উদ্দেশ্যে ঝাঁপ দেন। এ সময় প্রবল স্রোতের টানে মুহূর্তের মধ্যেই তিনি পানির নিচে তলিয়ে যান। সঙ্গে থাকা বন্ধুরা তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধারের চেষ্টা চালালেও স্রোতের কারণে তাঁকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হন।
স্থানীয় প্রশাসন জানায়, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভৈরব ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের একটি প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। শুক্রবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডুবুরিরা স্থানীয়দের সহায়তায় তল্লাশি চালালেও হাওরের প্রবল স্রোত, গভীর পানি এবং অন্ধকার নেমে আসায় রাত ৭টা ৪৫ মিনিটের দিকে প্রথম দিনের অভিযান স্থগিত করা হয়।পরবর্তীতে শনিবার (১১ জুলাই) সকাল ৭টা থেকে পুনরায় উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। তবে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নিখোঁজ শফিকুল ইসলামের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় তাঁর পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবারের সদস্যরা কেবল তাঁর মরদেহ উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, বর্ষা মৌসুমে প্রতিবছরই নিকলী হাওরের বিভিন্ন স্থানে কোনো না কোনো পর্যটক পানিতে ডুবে প্রাণ হারান। পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব, স্রোতের প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা না মানার কারণে এমন দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে বলে তারা মনে করেন।
তাদের মতে, পর্যটন এলাকার বিভিন্ন স্পটে নৌ-পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশের টহল আরও জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড, লাইফ জ্যাকেট বাধ্যতামূলক ব্যবহার, লাইফ বয়া, জরুরি উদ্ধার সরঞ্জাম, ভাসমান নিরাপত্তা পোস্ট এবং দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থার মতো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। এছাড়া পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ নিরাপত্তা কেন্দ্র স্থাপন এবং প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড নিয়োগেরও দাবি জানান স্থানীয়রা।
ভৈরব ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার লিডার তোফাজ্জল হোসেন বলেন, শুক্রবারের পাশাপাশি শনিবারও ডুবুরি দল নৌকাযোগে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে। তবে এখনো পর্যন্ত নিখোঁজ শফিকুল ইসলামের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রবল স্রোতের কারণে তিনি অনেক দূরে ভেসে যেতে পারেন। তবুও তাঁকে উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
মিঠামইন, নিকলী ও অষ্টগ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত নৌ-পুলিশ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) মো. নজরুল ইসলাম জানান, তাঁর অধীনে একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও আটজন কনস্টেবল দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ট্যুরিস্ট পুলিশের নিয়মিত টহলও অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও তিনি বলেন, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পর্যটকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলার বিকল্প নেই। এ বিষয়ে বিভিন্ন সচেতনতামূলক সভা-সেমিনারও পরিচালনা করা হচ্ছে। নিখোঁজ শফিকুলকে উদ্ধারে অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে তারাও সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন।
নিকলী থানার অফিসার ইনচার্জ মাহবুবুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ বা যোগাযোগ করা হয়নি। তবে খবর পাওয়ার পরপরই ভৈরব ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল শুক্রবার বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে, নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেহেনা মজুমদার মুক্তি, কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালের সঙ্গে শনিবার (১১ জুলাই) বিকেলে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের সাথে মুঠোফোনে সন্ধ্যা পরবর্তীতে কথা হলে নয়া দিগন্তকে জানান, নিকলীর পর্যটন এলাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি সেখানকার পর্যটকদের নিরাপত্তার লক্ষ্যে নিকলী উপজেলা প্রশাসনকে ইতিমধ্যে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি কখন কোথায় কোন অবস্থানে পানিতে নামা যাবে আর কোন অবস্থানে নামা যাবে সেই নির্দেশনার আলোকে সাইনবোর্ড এবং মাইকিংয়ের ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এছাড়াও উল্লেখ করেন সেখানকার রাস্তার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন যা পর্যটকদের জন্যে ইতিবাচক হবে।
বিশেষজ্ঞ ও উদ্ধারকারী সংস্থার দায়িত্বে থাকা অনেকের মতে, বর্ষা মৌসুমে হাওরের পানি অত্যন্ত গভীর ও স্রোত প্রবল থাকে। তাই পর্যটকদের অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট পরে নৌভ্রমণ করা, নির্ধারিত নিরাপদ স্থান ছাড়া কোথাও গোসলে না নামা, মাদক বা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবনের পর পানিতে না নামা, শিশুদের একা পানির কাছে যেতে না দেওয়া এবং আবহাওয়া প্রতিকূল হলে নৌভ্রমণ এড়িয়ে চলা উচিত। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী সংস্থার নির্দেশনা মেনে চললে অনেক দুর্ঘটনাই এড়ানো সম্ভব। বলে মতামত ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি অধিকতর জনসচেতনতা বৃদ্ধির পরামর্শ প্রদানের বিকল্প নেই বলেও উল্লেখ করেন।