কিশোরগঞ্জ -৫ আসনে দলীয় অন্ত কোন্দল চরমে
নিজেস্ব প্রতিবেদকঃ কিশোরগঞ্জের নিকলী ও বাজিতপুরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভক্তি আবারও প্রকাশ্যে এসেছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকী পালনকে কেন্দ্র করে। দলীয় নেতাকর্মীরা পৃথক পৃথক ব্যানার ও আয়োজনে ৩০ ও ৩১ মে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়াও দলীয় গ্রুপিংয়ের কারণে আসনটিতে সুবিধা নিচ্ছে আ’লীগের নেতা-কর্মীসহ অন্যান্য দলের নেতাকর্মীরা। মূল বিএনপি নেতাকর্মীরা অনেক ক্ষেত্রে কোনঠাসায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে নিহত রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে দেশের অন্যান্য স্থানের মতো নিকলী-বাজিতপুরেও দোয়া, আলোচনা সভা ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। তবে দলীয় সূত্র ও স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, একক কর্মসূচির পরিবর্তে বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এতে করে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়েও এ আসনটি ঘিরে ছিলো টালমাটাল পরিস্থিতি। আগ্নেয়াস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরণের অস্ত্রের ঝনঝনানিতে ভয়াবহ পরিস্থিতর রূপ নেয় তাৎক্ষণিক সময়ে। অস্ত্রসহ নাটকীয় গ্রেফতারের ঘটনাও ঘটে সেই সময়ে। নির্বাচনের দিনেও মারামারির ঘটনাসহ রাজনৈতিক মামলা ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিপরীতে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নিরলস পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে নজরদারি বাড়িয়ে দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতা দেখিয়েছে। নির্বাচন পরবর্তীতেও দুই উপজেলার বিক্ষিপ্ত স্থানে ঘটেছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার খবর। নির্বাচনে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে হেরে যায় বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী। সেখান থেকেই সৃষ্টি হয় ব্যাপক বহিস্কারের।
বাস্তবিক অর্থে নির্বাচন শেষ হলেও শেষ হয়নি সেখানকার দলীয় কোন্দল। বহিষ্কৃতদের সাথে যোগদান করে একাংশ বিএনপির নেতাকর্মীও। বিদ্রোহী প্রার্থী বলে আওয়ামীগের অধিকাংশ নেতাকর্মীও তাঁর পক্ষে কৌশলে কাজ করেছে বলে গুঞ্জন ছিল। যার প্রমাণ সংসদ নির্বাচন। তবে ইকবাল সমর্থকদের দাবি ইকবালের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও জনমতই তাঁকে বিজয়ী হতে সহায়তা করেছে। সরেজমিনে অভিযোগ উঠেছে দলীয় কোন্দলের কারণেই নানা দিক থেকে সুযোগ নিচ্ছে আওয়ামীলীগের সুবিধাভোগী তথা অন্যান্য দলের নেতাকর্মী এবং সমর্থকরা।
রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনে গত কয়েক বছর ধরেই বিএনপির অভ্যন্তরে মতপার্থক্য ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের বিষয়টি আলোচিত। স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাংশের দাবি, দলীয় গঠনতন্ত্র ও কেন্দ্রীয় নির্দেশনা লঙ্ঘনের অভিযোগে কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা বহিষ্কৃত হওয়ার পর থেকেই মাঠ পর্যায়ে বিভক্তির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দলীয় নির্দেশনা অমান্যের কারণে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয় কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা ও বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মজিবুর রহমান ইকবালকে। স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচিত হলেও দলে ঠাঁই মিলেনি। সেই সময়ে দলীয় নির্দেশনা অমান্যের কারণে বাজিতপুর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনিরসহ নিকলী উপজেলারও বেশ কিছু নেতাকর্মীকে বহিস্কার করা হয়। তবে সাম্প্রতিক ইকবালের নিজস্ব বাসভবনে তার কর্মী সমর্থকদের নিয়ে পৃথকভাবে শাহাদাত বার্ষিকী পালনের ঘটনা নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। এছাড়াও নিকলীসহ বাজিতপুরের একাধিক নেতা-কর্মীরা পৃথক পৃথকভাবে শাহাদাত বার্ষিকী পালন করেছে। স্থানীয় একটি মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে, দলীয় সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের বাইরে থেকেও বিএনপির ব্যানারে কর্মসূচি পালন শৃঙ্খলার প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সেখানে ব্যানারে শেখ মজিবুর রহমানকে প্রধান অতিথি করা হয়েছে। পাশাপাশি বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সমর্থকদের এক অংশ দাবি করেন, জিয়াউর রহমানের স্মরণে আয়োজিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে নিকলী-বাজিতপুরের বিএনপি কার্যত একাধিক বলয়ে বিভক্ত। একটি অংশ কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক ধারার সঙ্গে সক্রিয় থাকলেও অপর অংশটি স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের অনুসারী হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে। ফলে সাধারণ সমর্থকদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা। সরেজমিনে সাধারণ ভোটার ও সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে অনেকের মধ্যেই অনিশ্চয়তা ও প্রশ্ন রয়েছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, নির্বাচনের সময়ে নেতারা জনগণের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচনের পরে মাঠে দেখা যায় না। নেতারা নির্বাচনের পূর্বে ভোটে জিতার লক্ষ্যে নানান অভিনয়ের মধ্য দিয়ে যেভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন পরবতীতে ব্যতিক্রমী রূপ ফুটে উঠে। অনেকেই অভিযোগ তোলে বলেন, সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে চেষ্টাতো দূরের কথা ফোনেও সঠিক সময়ে নেতাদের উত্তর মিলেনি। আবার অনেকেই মনে করেন, দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণেই স্থানীয়ভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে। যে কারণে খোঁজ খবর নেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। এছাড়াও রাজনৈতিক মহলের অসংখ্য জনগণের মতে, সময়মতো সাংগঠনিক সমন্বয় ও নেতৃত্বের সংকট নিরসন করা না গেলে ভবিষ্যতে এই বিভক্তি আরও প্রকট হতে পারে। ইতোমধ্যে ত্রাণ বিতরণ, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক উদ্যোগকে কেন্দ্র করেও মতবিরোধের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে মামলা-মোকদ্দমা, গ্রুপিং এবং প্রভাব বিস্তারকে ঘিরে উত্তেজনার ঘটনাও ঘটেছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এ প্রসঙ্গে বাজিতপুর পৌর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র এহসান কুফিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা ও ত্যাগের রাজনীতি প্রশ্নবিদ্ধ হলে দীর্ঘদিনের কর্মীদের হতাশ হওয়াই স্বাভাবিক। এক পর্যায়ে ক্ষোভ প্রকাশের সাথে গণমাধ্যমকমীর কাছে জানতে চান “ধানের শীষের পক্ষে নির্বাচন করে করা কি বড় ভুল ছিলো”
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে অংশগ্রহণকারী বদরুল আলম শিপু বলেন, বহিষ্কৃত নেতারা যদি দলীয় ব্যানারে কর্মসূচি পালন করে থাকেন, সেটি সাংগঠনিকভাবে মূল্যায়নের বিষয়। একইসঙ্গে তিনি স্বীকার করেন যে, বিএনপির নেতৃত্বের সমন্বয়হীনতা ও দায়িত্ব পালনে ঘাটতির কারণেই বিভক্তির চিত্র তৈরি হয়েছে। এছাড়াও বহিষ্কৃতরা যেখানে দলীয় বৃহৎ সিদ্ধান্তকে অমান্য করে সেখানে এই নিয়ে তাঁর নতুন করে কিছু বলার নাই। তাদের কার্যক্রমই প্রমাণ করে তারা দলকে কতটা মূল্যয়ন করে।
নিকলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট বদরুল মোমেন মিঠু বলেন, “দলীয় গঠনতন্ত্র মেনেই আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করছি। বহিষ্কৃত ব্যক্তিরা কীভাবে দলীয় পরিচয়ে কর্মসূচি পালন করছেন, সে বিষয়ে আমরা অবগত নই।” তিনি অভিযোগ করেন, বহিষ্কৃতদের একটি অংশ দলের সাংগঠনিক ক্ষতির সঙ্গে জড়িত। নানান অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে থাকার বিষয়েও তিনি ইঙ্গিত করেন। প্রকৃতপক্ষে ওরা দলের মঙ্গল কামনা করেননি বলেও জানান।
অন্যদিকে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের প্রতিক্রিয়া জানতে ১ জুন, বিকালে তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নিকলী-বাজিতপুরে বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নেতৃত্বের বিরোধ নিরসন না হলে আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণে এর প্রভাব পড়তে পারে। জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে আসা বিভক্তির চিত্র সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।