• শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০১:২৪ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা ও গুলির ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের নামে মামলা নিকলীতে প্রবীণ আওয়ামীগ নেতা ও সাবেক ৪ বারের চেয়ারম্যান আজমল হোসেন গ্রেফতার  আবহাওয়ার আমূল পরিবর্তনের ফলে হাওরের জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ও জনজীবনে চ্যালেঞ্জ      হাওরে প্রবেশদ্বার এলাকায় দস্যুদের তাণ্ডব: শিশুকে হত্যা হুমকিতে লুটে নেয় আড়াই লক্ষাধিক টাকা হাওরাঞ্চলের চামড়া অধিকাংশ মাদ্রাসা ও এতিমখানায় আর অনেকে পুঁতে রাখাসহ নদী ও ডোবানালায় ফেলেছেন নিকলী-বাজিতপুরে বিএনপিতে বিভক্তি, সুবিধা নিচ্ছে আ’লীগ মুষলধারে বৃষ্টিতেও শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজীর ঢল ঐতিহ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনের প্রাণকেন্দ্র বাজিতপুর বাজার বাজিতপুরে যুবকের ওপর হামলার অভিযোগ, মুখে ২৪ সেলাই ‘জাকির ভাই আমাকে জীবন ভিক্ষা-দে’ হত্যার সময়ে কুলিয়ারচরে ব্যবসায়ীর আকুতি, গ্রেফতার-৫ কিশোরগঞ্জে ইপিআই টিকার ঘাটতি, উদ্বেগ বাড়ছে কাঙ্খিত স্বাস্থ্য সেবায়, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে মা ও শিশু 

ঐতিহ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনের প্রাণকেন্দ্র বাজিতপুর বাজার

Reporter Name / ২১ Time View
Update : বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬

আলি জামশেদ: হাওরাঞ্চলের এক ঐতিহ্যবাহী উপজেলার নাম বাজিতপুর। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক জনপদই নয়, বরং ভাটি বাংলার মানুষের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই জনপদের প্রাণ হিসেবে পরিচিত “বাজিতপুর বাজার”। শত বছরের ইতিহাস, নদীপথের যোগাযোগ, হাওরাঞ্চলের কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে এ বাজারের নাম।

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে সপ্তাহের প্রতি রবিবার হলে বসে বড় পরিসরে শাকসবজি ও ফলমূলের পাশাপাশি হাঁস-মুরগিসহ বিভিন্ন ধরনের পাখির হাট। এছাড়াও নিত্য দিন দেখা মিলে অসংখ্য পুরুষের পাশাপাশি নারীদের কেনাকাটার দৃশ্য। বিশেষ করে ঈদের সময়ে অনেক বেশি ভীড় থাকে। আর এখানকার স্থানীয়রা কোরবানির ঈদের সময় হলে বাজিতপুর বাজারের বাঁশ মহল এলাকা থেকেই দুই-একদিন আগে অধিক পরিমাণে কোরবানির পশু ক্রয় করে থাকেন। চলতি বছরের বৈরী আবহাওয়াতেও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে চলতি বছর অভিযোগ উঠেছে আশেপাশের হাটের তুলনায় অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের বিষয় ঘিরে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছ থেকে প্রতি পশুতে দুই হাজার টাকা করে হাসিল আদায় করে নেন পশু হাট ইজারাদার কর্তৃপক্ষ। সরেজমিনে ২৬ মে, বিকালে হাজার হাজার পশু ও মানুষের উপস্থিতির দৃশ্য ফুটে উঠে। সেই সাথে ভীড়ের মাঝে কাঙ্খিত বেচাকেনা করতেও দেখা গেছে।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, একসময় পুরো অঞ্চলটি ছিল খাল-বিল, জলাভূমি ও হাওরে পরিপূর্ণ দুর্গম এলাকা। কালের বিবর্তনে গড়ে ওঠা এ জনপদ ধীরে ধীরে ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাজিতপুরকে ভাটি অঞ্চলের প্রবেশদ্বার বলেই আখ্যায়িত করা হয়।

বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয় বরং কৃষি, মৎস্য ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেখানকার এই হাওর অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবেও দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সে সাথে হাওরের পাশাপাশি এখানকার এই বাজারও অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে থাকে। ভাটি বাংলার মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষিপণ্য বিপণন, মৎস্য ব্যবসা থেকে শুরু করে নানা দিক থেকে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এ বাজার।

ঐতিহাসিকভাবেও বাজিতপুর ছিল হাওরাঞ্চলের যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। একসময় নদীপথই ছিল মানুষের প্রধান যাতায়াত মাধ্যম। তখন হাওরের বিভিন্ন এলাকা থেকে নৌকাযোগে কৃষক, জেলে ও ব্যবসায়ীরা ধান, পাট, মাছসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে বাজিতপুর বাজারে আসতেন। এ বাজারকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিশাল পরিসর। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, বর্ষা মৌসুমে বাজিতপুর বাজার ছিল নৌ-বানিজ্যের শহর। অসংখ্য কাটমহল ও গড়ে উঠে এ বাজার কেন্দ্রীক। এক সময়ে শত শত মালবাহী নৌকা বাজার ঘাটে ভিড় করত। তাছাড়াও হাওরাঞ্চলের উৎপাদিত ধান, শুঁটকি ও দেশীয় মাছ এখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হতো। ফলে বাজারটি শুধু একটি স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি হাওরে অর্থনীতির অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি পায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওর অঞ্চলের অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি ও মৎস্যসম্পদ। এই দিক থেকে এ বাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

অনুসন্ধানে উঠে আসে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নসহ পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকেও মানুষ প্রতিদিন কেনাকাটা, ব্যবসা ও চিকিৎসাসহ নানা প্রয়োজনে এসে থাকেন। এ বাজারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কাপড়ের দোকান, স্বর্ণের দোকান, মাছ-মাংসের আড়ত, কাঁচাবাজার, ফার্মেসি, ইলেকট্রনিক্স ও মোবাইল সামগ্রিকসহ নানাবিধ ব্যবসা এখন এ বাজারের অর্থনীতিকে বহুমুখী করে তুলেছে। পাশাপাশি হাওরাঞ্চলের কৃষিপণ্য ও মৎস্য সম্পদ এখনও এ বাজারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। সেই সাথে রয়েছে সরকারি রয়েছে বেশ কিছু ব্যাংক ও বীমা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। যানজট, অপরিকল্পিত দোকান স্থাপন, ড্রেনেজ সংকট, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধার অভাবসহ ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভোগান্তির কারণ বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারী বর্ষণ হলে এ বাজারের বাঁশ মহলের পূর্ব দিকের মেথরপট্রির সংলগ্ন রাস্তাটি তলিয়ে যায়। এক কথায় বলা চলে সরু রাস্তার কারণেই দেখা দিয়েছে বৃহৎ সমস্যা। সচেতন মহলের দাবি, ঐতিহ্য ধরে রেখে আধুনিক পরিকল্পনার মাধ্যমে বাজারকে আরও সুশৃঙ্খল ও নান্দনিকভাবে গড়ে তোলা জরুরি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করেন, বাজিতপুর বাজার শুধু কেনাবেচার স্থান নয়; এটি এই অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগের অংশ। শত বছরের ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে আজও বাজারটি ভাটি বাংলার মানুষের আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক হয়ে আছে। তাই বাজারের ঐতিহ্য সংরক্ষণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে বাজিতপুর বাজার আরও বৃহৎ আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাজারের ভবিষ্যত ভাবনা থেকে সচেতন মহলের লোকেরা আরও  বলেন, আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনা, কোল্ড স্টোরেজ ও কৃষিপণ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে বাজিতপুর বাজার দেশের অন্যতম বৃহৎ এক হাওরভিত্তিক বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এছাড়া তাঁরা আরও বলেন, হাওর অঞ্চলের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে বাজিতপুর বাজারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। কারণ এই বাজার শুধু কেনাবেচার স্থান নয়; এটি হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও অর্থনৈতিক স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি।

ভাটি বাংলার ঐতিহ্য ও অর্থনীতির ধারক হিসেবেও বাজিতপুর বাজার আজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে ভবিষ্যতে এ বাজার হাওর অর্থনীতির আরও বৃহৎ কেন্দ্র হিসেবে দেশব্যাপী নতুন পরিচিতি লাভ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd