• শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০১:২৪ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা ও গুলির ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের নামে মামলা নিকলীতে প্রবীণ আওয়ামীগ নেতা ও সাবেক ৪ বারের চেয়ারম্যান আজমল হোসেন গ্রেফতার  আবহাওয়ার আমূল পরিবর্তনের ফলে হাওরের জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ও জনজীবনে চ্যালেঞ্জ      হাওরে প্রবেশদ্বার এলাকায় দস্যুদের তাণ্ডব: শিশুকে হত্যা হুমকিতে লুটে নেয় আড়াই লক্ষাধিক টাকা হাওরাঞ্চলের চামড়া অধিকাংশ মাদ্রাসা ও এতিমখানায় আর অনেকে পুঁতে রাখাসহ নদী ও ডোবানালায় ফেলেছেন নিকলী-বাজিতপুরে বিএনপিতে বিভক্তি, সুবিধা নিচ্ছে আ’লীগ মুষলধারে বৃষ্টিতেও শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজীর ঢল ঐতিহ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনের প্রাণকেন্দ্র বাজিতপুর বাজার বাজিতপুরে যুবকের ওপর হামলার অভিযোগ, মুখে ২৪ সেলাই ‘জাকির ভাই আমাকে জীবন ভিক্ষা-দে’ হত্যার সময়ে কুলিয়ারচরে ব্যবসায়ীর আকুতি, গ্রেফতার-৫ কিশোরগঞ্জে ইপিআই টিকার ঘাটতি, উদ্বেগ বাড়ছে কাঙ্খিত স্বাস্থ্য সেবায়, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে মা ও শিশু 

হাওরে প্রবেশদ্বার এলাকায় দস্যুদের তাণ্ডব: শিশুকে হত্যা হুমকিতে লুটে নেয় আড়াই লক্ষাধিক টাকা

Reporter Name / ১০ Time View
Update : বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬

আলি জামশেদঃ হাওরের প্রবেশদ্বার বাজিতপুরের পাশাপাশি অল্প দিনের ব্যবধানে নিকলীতে আবারও ভয়াবহ ডাকাতি। একেকটি লোমহর্ষক ঘটনা নানা নাটকীয়তার জন্ম দিচ্ছে। প্রতিটি ঘটনার পরবর্তীতে কিছু সময় নিরব থাকলেও পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বিক্ষিপ্ত স্থানে। তবে স্থানীয় প্রশাসনের ভাষ্য, অপরাধ দমনে নানামুখী তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয়দের ভয় বাড়ছে বর্ষা মৌসুম ঘিরে।

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার সরারচরের সংখ্যালঘু পরিবারসহ একাধিক স্থানের ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নেমে এসেছে নিকলীর হাওর পাড়ের নির্জন এলাকাতেও অসহায় এক পরিবারের উপরে দস্যুদের ভয়ানক বিভীষিকা। মহিষ বিক্রির আড়াই লাখ টাকার সন্ধানে গভীর রাতে ঘরে ঢুকে এক পরিবারের সদস্যদের ওপর চালানো হয়েছে নির্মম নির্যাতন। তিন বছরের একমাত্র শিশুকে পা বেঁধে উল্টো করে তুলে হত্যা করার হুমকি, মাকে কুপিয়ে জখম এবং গৃহবধূকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়াও রাস্তাঘাটে দস্যুদের কবলে পড়ে অনেকেই অর্থ ও মালামাল হারানোর পাশাপাশি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। উল্টো হয়রানির ভয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আইনের ধারস্থও হতে চাননি বলে জানা গেছে।

নিকলী উপজেলার সাহাপুর গ্রামের গত ১ লা জুনের দিবাগত রাতের ঘটনার পর গুরুতর আহত মা ও ছেলে বর্তমানে ভাগলপুরের জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, শান্তিপ্রিয় এই বিলপাড়ে এমন নৃশংস ঘটনার নজির তাদের জানা ইতিহাসে নেই।

সরেজমিনে জানা যায়, নিকলী উপজেলার জারইতলা ইউনিয়নের সাহাপুর গ্রামের রোয়া বিলপাড়ের উত্তর দিকের শান্তিপুর এলাকায় গত ছয় বছর ধরে বসবাস করে আসছেন মৃত সেলিমের ছেলে হৃদয় (২৫) ও তার পরিবার। প্রায় ১৫ বছর আগে পিতার মৃত্যুর পর সাহাপুর গ্রামের ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ ছেড়ে বিলপাড়ে মাটি ভরাট করে একটি দোচালা টিনের ঘর এবং সম্মুখভাগে পাকা কক্ষ নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন তারা।

স্থানীয়দের দাবি, শত বছরের ইতিহাসেও এই এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেনি। এ ঘটনার পর হাওরপাড়ের নির্জন এলাকায় বসবাসকারী অনেক পরিবারই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানান ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি কামরুল ইসলাম ও সহ-সভাপতি জঙ্গু মিয়া।

ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কোরবানির ঈদের আগে দুইটি ষাঁড় মহিষ বিক্রি করে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা পান হৃদয়। সেই তথ্য জেনে পরিকল্পিতভাবে সংঘবদ্ধ দস্যুরা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ১ জুন সোমবার দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে থাকাকালে চারজন দস্যু কৌশলে মুখোশ পড়ে ঘরে প্রবেশ করে। এ সময় আরও কয়েকজন বাইরে অবস্থান করছিল বলে জানা যায়। ঘরে ঢুকেই দস্যুরা পরিবারের সদস্যদের হাত-পা ও মুখ কাপড় দিয়ে বেঁধে ফেলে এবং মহিষ বিক্রির টাকার অবস্থান জানতে চায়।

টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হৃদয়ের ওপর শুরু হয় বর্বর নির্যাতন। লোহার রড ও ধারালো দা দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে তাকে আহত করা হয়। তার বিধবা মাকেও পেছন থেকে মাথায় কুপিয়ে জখম করা হয়। স্ত্রী স্বপ্নাকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে আহত করা হয়। এ সময় তিন বছরের শিশুপুত্রকে পা ধরে উল্টো করে ঝুলিয়ে হত্যা করার হুমকি দেয় দস্যুরা। সন্তানের জীবন রক্ষার আকুতি আর অসহায়ত্বের কাছে হার মেনে অবশেষে হৃদয় মহিষ বিক্রির ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা দস্যুদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন। এ ঘটনা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে পরবর্তীতে ভয়াবহ পরিণতি হবে বলেও হুমকি দিয়ে যান।

                  ছবিতে আহত পরিবারের সদস্যরা 

স্থানীয়রা জানান, নগদ অর্থ ছাড়াও দস্যুরা স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যায় এবং ঘরের বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুরে অবস্থিত জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।

জারইতলা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি জঙ্গু মিয়া বলেন, “এটা পরিকল্পিত একটি ভয়ঙ্কর দস্যুতা। পরিবারের তিন সদস্য গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঘটনাস্থলের ২০০ গজের মধ্যে আর কোনো বসতঘর নেই। এমন নির্জন পরিবেশে ডাকচিৎকার করলেও সাহায্য পাওয়ার সুযোগ ছিল না। ফলে শুধু এই পরিবার নয়, হাওরের নির্জন এলাকায় বসবাসকারী অনেক মানুষই এখন আতঙ্কে রয়েছেন।”

নিকলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি কামরুল ইসলাম বলেন, “আমার বাড়ির পাশেই এমন ঘটনা ঘটেছে। শত বছরের ইতিহাসেও এ ধরনের ঘটনার নজির নেই। নগদ ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা লুট, স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্মম হামলা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের কঠোর শাস্তি দাবি করছি।”

জারইতলা ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা ইসহাক রানা এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এই ধরণের ঘটনা আমার দায়িত্বের পর এই প্রথম ঘটেছে সাহাপুর গ্রামে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। অনুসন্ধানী তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে তিনি উপর মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এবং কঠিন বিচারের দাবি জানান।

এ বিষয়ে নিকলী থানার অফিসার ইনচার্জ মাহবুবুর রহমান বলেন, “সাহাপুরের ঘটনাটি প্রকৃতপক্ষে ডাকাতি নয়, বরং দস্যুতা। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মারধর ও অর্থ লুটের বাস্তবতা আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি। এ ঘটনায় মামলা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান।” তাছাড়াও নিকলীর সার্বিক পরিস্থিতির দিক বিবেচনায় টুরিষ্ট পুলিশসহ নৌপথে নিকলী ও করিমগঞ্জের বালিখলা পর্যন্ত বিশেষ নিরাপত্তার বিষয়ের গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। অচিরেই হাওরবাসীর নিরাপত্তার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হবে বলেও ইঙ্গিত করেন।

বাজিতপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তৃপ্তি মন্ডলের সরকারি নম্বরে ২ জুন, দুপুরের দিকে ফোন করা হলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। এছাড়াও কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সরকারি মোবাইল নম্বরেও একই দিনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় মূলত একের পর এক ঘটে হাওরে প্রবেশদ্বার এলাকার ডাকাতির ঘটনা ও বর্ষার পূর্ব প্রস্তুতি সম্পর্কে জানার লক্ষ্যে। কিন্তু কোনোভাবেই যোগাযোগ সম্ভব হয়ে উঠেনি।

হাওরের বিস্তীর্ণ নির্জন জনপদে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে বিচ্ছিন্ন জনপদ ও বিলপাড়ের ন্যায় বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে দিন দিন। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা না গেলে হাওরাঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তাহীনতা আরও প্রকট হয়ে উঠবে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে হাওরাঞ্চলে বর্ষা মৌসুম এলেই জলরাশি যেমন প্রকৃতিকে নতুন রূপ দেয়, তেমনি কিছু এলাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়িয়ে তোলে। বিশেষ করে দ্বীপসদৃশ বিচ্ছিন্ন বসতি কিংবা জনবসতি থেকে দূরে এককভাবে বসবাসকারী পরিবারগুলো দস্যুতা, চুরি ও অন্যান্য অপরাধের ঝুঁকিতে বেশি থাকে। অতীতে হাওরের মানুষ সাধারণত ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামে একত্রে বসবাস করতেন। এতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো। কিন্তু বর্তমানে অনেকেই খোলামেলা পরিবেশ, সড়ক যোগাযোগের সুবিধা এবং ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের কারণে রাস্তার ধারে বা অপেক্ষাকৃত নির্জন স্থানে বসতি গড়ে তুলছেন। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিবেশীর সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। জনস্বার্থ বিবেচনায় সচেতন মহলের মতামত, বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে শুধু যোগাযোগ সুবিধা নয় বরং নিরাপত্তার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের টহল বৃদ্ধি, গ্রামভিত্তিক পাহারা ব্যবস্থা জোরদার এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বর্ষা মৌসুমেও হাওরবাসীর নিরাপত্তা অনেকাংশে সম্ভব। এই বিষয়ে হাওরের প্রবেশদ্বার নিকলী-বাজিতপুর ও আশেপাশের হাওরে গ্রাম ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পূর্ব প্রস্তুতি চলছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

নিকলী-বাজিতপুর একের পর ঘটে যাওয়া ডাকাতির ঘটনার বিষয় ও বর্ষা মৌসুম ঘিরে কি ধরণের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে এই বিষয়টি জানার লক্ষ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমানকে ইকবালকে তার ব্যক্তিগত নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd