আলি জামশেদঃ কিশোরগঞ্জের নিকলীতে পৃথক দুটি মৃত্যুর ঘটনায় আবারও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। একটি ঘটনা অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে, অপরটি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, হাওরের বিভিন্ন স্থানে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে অতীতের মতোই ক্ষমতাসীনদের একাংশের দ্বন্দ্ব এখনো চরমে রয়েছে। স্বার্থসংশ্লিষ্টতার জেরে যে কোনো সময় আরও বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে বলেও মনে করছেন স্থানীয়রা।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ছাতিরচর ইউনিয়নে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে কাসেম আলী (৬৫) নিহত হয়েছেন বলে জানান স্থানীয়রা। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে বলেও জানিয়েছেন স্বজনরা। প্রশাসনের ভাষ্যমতে, বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করেই ঘটনার সূত্রপাত এবং এতে একাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। বিষয়টি সম্পর্কে থানা পুলিশ অবগত রয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা না হলে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই হাওরের বুকজুড়ে জলরাশির সৌন্দর্য বেড়ে যায়। তবে এর পাশাপাশি বেড়ে যায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে নদীর বুক থেকে রাতের আঁধারে অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে। প্রতিবছরের মতো এবারও নিকলী ও বাজিতপুরের একাধিক এলাকায় বালু উত্তোলন নিয়ে গ্রুপিং দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকাশ্যেই চলছে বালু উত্তোলন ও ভরাটের কার্যক্রম। ঘোড়াউত্রা নদী থেকে রাতের আঁধারে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে ১৮ জুলাই দিবাগত মধ্যরাতে ছাতিরচরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বিএনপি নেতা কাসেম আলী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এছাড়া একাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ঘটনাটি নিয়ে এলাকাজুড়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার হাওর দ্বীপখ্যাত ছাতিরচরের ঘোড়াউত্রা নদী ইতোমধ্যে শত শত বসতভিটা গ্রাস করেছে। এছাড়াও ধনু নদীর বুকে শতশত বসত ভিটা হারিয়ে গেছে। এ কারণে নদী রক্ষায় সরকার দীর্ঘদিন ধরে মেগা প্রকল্পের আওতায় কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু এক শ্রেণির বালুখেকো রাতের আঁধারে ছাতিরচরের সরপি কান্দাসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে। চলতি বছরও সরেজমিনে একই চিত্র দেখা গেছে। এ ঘটনায় নদী লিজের প্রথম ডাককারী হিসেবে পরিচিত রমিজ মেম্বার বালু উত্তোলনে বাধা দিতে ঘটনাস্থলে যান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে জুম্মন নামের এক ব্যক্তিসহ কয়েকজন ১৮ জুলাই দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে বাজারের উত্তর পাশে সৌদি প্রবাসী সৈকতের বাড়ির উঠানে বসে থাকা অবস্থায় রমিজের ওপর হামলা চালায়। এ সময় তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন তার ঘনিষ্ঠ কাসেম আলী। একপর্যায়ে ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহ-সভাপতি কাসেম আলী ঘটনাস্থলেই ঢলে পড়েন। পরে স্থানীয় পল্লিচিকিৎসকরা তার হার্টবিট পরীক্ষা করে না পাওয়ায় তাকে দ্রুত নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় নিহতের ছেলে মাইন উদ্দিন বাদী হয়ে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান আহত রমিজ উদ্দিন। তিনি অভিযোগ করেন, তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করা হয়। তার চিৎকার শুনে হিরা মিয়া এগিয়ে এলে তাকেও আঘাত করা হয়। এ সময় ঘর থেকে বেরিয়ে সৌকত টর্চলাইটের আলোয় অস্ত্র হাতে জুম্মনকে দেখতে পান বলে দাবি করেন।
ছাতিরচর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদ হাসান জাকির বলেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার পাশাপাশি নদীর বুক থেকে চিরতরে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। সরকারের প্রতি এ বিষয়ে তার আকুল আবেদন রয়েছে। একই দাবি জানিয়েছেন নদীতীরবর্তী অসংখ্য মানুষও। তাদের মতে, বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে নদীতীরের সকল ভূমি বিলীন হবে এবং এ নিয়ে দলীয় সংঘাত আরও বাড়বে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষিত যুবক বলেন, বালু উত্তোলনের সাথে নেপথ্যে থেকে যারা এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন তারা সচরাচর ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে। সবাই জানে তাদের নাম কিন্তু ভয়ে কেউ তাদের নাম বলে না। ওরা ক্ষমতাসীন শীর্ষ পর্যায়ের লোক। এদের সাথে আঁতাত স্থানীয় প্রশাসনের। যে কারণে এ সব অপকর্ম দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ জনগণও ভয়ে প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে।
অন্যদিকে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে বিদ্যুতের খুঁটিতে উঠে লাফ দিতে গিয়ে গত ১৮ জুলাই দুপুরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নিকলী উপজেলার কারপাশা ইউনিয়নের নানশ্রী বাগুয়াখালী গ্রামের রবু মিয়ার ছেলে মোনায়েম (১৪) নিখোঁজ হয়। দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা পর স্থানীয়রা তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে ১৯ জুলাই রোববার নানশ্রী দারুল কুরআন নুরানিয়া হাফিজিয়া মাদরাসা মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয় বলে স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। পরে তাকে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক শিশু বিদ্যুতের খুঁটিতে উঠে উপর থেকে পানিতে লাফ দেয় এবং সেই দৃশ্য টিকটক ও ফেসবুকে আপলোড করে। মোনায়েমও একইভাবে লাফ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎবাহী তারে হাত লেগে গুরুতর আহত হয়। পরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট অবস্থায় নিচে পড়ে পানিতে তলিয়ে যায় এবং স্রোতের টানে নিখোঁজ হয়ে যায়।
নিকলী থানার অফিসার ইনচার্জ মাহবুবুর রহমান বলেন, বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলছিল। এরই জেরে ১৮ জুলাই দিবাগত মধ্যরাতে মারামারির ঘটনা ঘটে। তবে প্রাথমিকভাবে নিহত কাসেম আলীর শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় থানায় কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরদিকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শিশুর মৃত্যুর ঘটনায়ও পুলিশ অবগত রয়েছে। তিনি জানান, দুপুরে নিখোঁজ হওয়ার পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের সাথে বাজিতপুর বাজারের উত্তর দিকের জলাশয় ভরাটসহ নিকলীর ছাতিরচরের বালি উত্তোলনের অনিয়মের বিষয়ে মুঠোফোনে কথা হলে এই বিষয়ে তাঁকে অবগত করা হয়নি বলে উল্লেখ করেন। তবে এ সব ঘটনার খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান।