• শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৬ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা ও গুলির ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের নামে মামলা নিকলীর হাওরে থেমে গেছে বৈঠার ঝড় হারিয়ে যাচ্ছে নৌকা বাইচের ঐতিহ্য, ক্ষয়ে যাচ্ছে হাওরের লোকসংস্কৃতি ও পর্যটন সম্ভাবনা নিকলীতে বালু উত্তোলনের ঘটনাসহ পৃথক ঘটনায় নিহত –২ পর্যটন হাওরে গোসলে নেমে নিখোঁজ পর্যটক ২৪ ঘণ্টা পেরিয়েও মেলেনি সন্ধান, উদ্ধার অভিযান অব্যাহত হাওরে মাছ কমছে, প্রভাব পড়ছে কিশোরগঞ্জের শতবর্ষী শুঁটকি শিল্পে  নিকলীতে প্রবীণ আওয়ামীগ নেতা ও সাবেক ৪ বারের চেয়ারম্যান আজমল হোসেন গ্রেফতার  আবহাওয়ার আমূল পরিবর্তনের ফলে হাওরের জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ও জনজীবনে চ্যালেঞ্জ      হাওরে প্রবেশদ্বার এলাকায় দস্যুদের তাণ্ডব: শিশুকে হত্যা হুমকিতে লুটে নেয় আড়াই লক্ষাধিক টাকা হাওরাঞ্চলের চামড়া অধিকাংশ মাদ্রাসা ও এতিমখানায় আর অনেকে পুঁতে রাখাসহ নদী ও ডোবানালায় ফেলেছেন নিকলী-বাজিতপুরে বিএনপিতে বিভক্তি, সুবিধা নিচ্ছে আ’লীগ মুষলধারে বৃষ্টিতেও শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজীর ঢল

নিকলীর হাওরে থেমে গেছে বৈঠার ঝড় হারিয়ে যাচ্ছে নৌকা বাইচের ঐতিহ্য, ক্ষয়ে যাচ্ছে হাওরের লোকসংস্কৃতি ও পর্যটন সম্ভাবনা

Reporter Name / ৭৫ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

২০১৭ সালের সর্বশেষ নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা দৃশ্য

আলি জামশেদঃ বর্ষা এলেই একসময় নিকলীর হাওর জেগে উঠত বৈঠার ছন্দে। রংবেরঙের নৌকা ছুটত জলের বুক চিরে, শত শত বৈঠার ওঠানামায় উঠত নিধি রকমের ঢেউ; মাঝিমাল্লার হুংকার, সারি গানের সুর আর দুই তীরে হাজারো দর্শকের উচ্ছ্বাসে হাওর পরিণত হতো উৎসবের মঞ্চে। সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই স্মৃতি।

নিকলীতে নৌকা আছে, হাওর আছে, পর্যটকও আছে—কিন্তু নেই নিয়মিত নৌকা বাইচের সেই জৌলুশ। অথচ ২০১৭ সালে সোয়াইজনী নদীতে ১০টি নৌকার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বাইচে বিপুল দর্শক সমাগম হয়েছিল। পরবর্তী ঘোড়াউত্রা নদীতেও নৌকা বাইচের আয়োজনও হয়েছিল। তৎকালীন আইজিপি বেনজীর আহমেদ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাই প্রশ্ন আজ একটাই— কেনো থেমে গেল বৈঠার সেই ঝড়?

নৌকা বাইচকে শুধু একটি প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি হাওরবাসীর লোকজ সংস্কৃতি, সামাজিক মিলন ও নির্মল বিনোদনের অংশ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাঝিমাল্লার দক্ষতা, ঐতিহ্যবাহী নৌকা নির্মাণ, সারি-ভাটিয়ালি গান, স্থানীয় খাবার, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও নৌযান নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা। ফলে বাইচ হারানো মানে কেবল একটি খেলা হারানো নয়; হারিয়ে যাওয়া একটি জনপদের সাংস্কৃতিক স্মৃতিরও অংশ।

এখনো হাওর আছে, পর্যটন আছে—বাইচ নেই কেন? নিকলী ইতোমধ্যে হাওরভিত্তিক পর্যটনের এক অতি পরিচিত নাম। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসে নৌ-ভ্রমণ ও জল-প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো পর্যটন শুধু জলরাশি দেখার নাম নয়। প্রকৃতির সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতি, উৎসব, গান, খাবার ও ঐতিহ্য যুক্ত হলেই একটি পর্যটনকেন্দ্র পায় আলাদা পরিচয়। সেই জায়গায় নিকলীর নৌকা বাইচ হতে পারে সবচেয়ে স্বতন্ত্র আকর্ষণীয় একটি স্থান। প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে ‘নিকলী নৌকা বাইচ উৎসব’ আয়োজন করা গেলে হাওর দেখতে আসা পর্যটক শুধু দর্শক থাকবেন না—তাঁরা অংশ নেবেন একটি জীবন্ত লোক ঐতিহ্যের উৎসবে। এতে মাঝি, নৌকার মালিক, খাবারের দোকানি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট মানুষের আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।

পরিতাপের বিষয় হাওরে কমছে পানি, সংকুচিত হচ্ছে জলপথ। প্রকৃতপক্ষে নৌকা বাইচের জন্য প্রয়োজন প্রশস্ত ও নিরাপদ জলপথ। কিন্তু নিকলীর বাস্তবতায় সব মৌসুমে সেই জলভরা পরিবেশ থাকে না। কখনো বৃষ্টিপাত দেরিতে বা কম হলে হাওরে পানি ঢুকতে সময় লাগে। আবার খাল-নদীর নাব্যতা কমে গেলে পানি চলাচলও বাধাগ্রস্ত হয়। অনুসন্ধানে উঠে আসে ২০২৩ সালেও দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হওয়ায় নিকলীর হাওরে বর্ষার পানি আসতে দেরি এবং পর্যটন কার্যক্রমে ভাটা পড়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল বিভিন্ন গণমাধ্যমে। সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের মার্চেও নিকলীর আড়িবিল খাল পুনর্খনন কর্মসূচি শুরু হয়। লক্ষ্য নদী-বিলের সঙ্গে সংযোগ রেখে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা। একই সময়ে স্থানীয়ভাবে শতবর্ষী খাল ভরাট ও পানিপ্রবাহ বন্ধ হওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। এছাড়াও এ সংক্রান্ত অসংখ্য ঘটনা স্থানীয়ভাবে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

অর্থাৎ নিকলীর পানির সংকটকে শুধু ‘পানি কমে যাওয়া’ বলে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বৃষ্টির স্বাভাবিকতা, খাল-নদীর সংযোগ, পলি জমা, নাব্যতা ও মানুষের হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়েই হাওরের জলচক্র নির্ধারিত হয়।

প্রকৃতিও বদলাচ্ছে হাওরের পানি নির্ভর জীবন জীবিকার চিত্র। পানি কখন আসে, কতটা আসে এবং কতদিন থাকে—তার ওপর নির্ভর করে কৃষি, মাছ, নৌযাতায়াত ও পর্যটন। তাই জলপ্রবাহের সামান্য পরিবর্তনও হাওরের অর্থনীতি ও পরিবেশে প্রভাব ফেলে।

একদিকে পানি কমে গেলে নৌযাতায়াত ও বাইচ ব্যাহত হয়; অন্যদিকে আকস্মিক অতিবৃষ্টি বা ঢলে হাওরের নিম্নাঞ্চল দ্রুত প্লাবিত হতে পারে।

২০২৬ সালেও নিকলীর হাওরে অতিবৃষ্টি ও পানির আকস্মিক বৃদ্ধির কারণে বোরো ধান ক্ষতির খবর এসেছে। প্রকৃতির এই বৈপরীত্যই হাওরের বাস্তবতা—কখনো পানি নেই, কখনো সেই পানিই জীবন ও জীবিকার জন্য হুমকি।ঐতিহ্য ফিরবে কীভাবে?

নৌকা বাইচ ফিরিয়ে আনতে বড় আয়োজনের চেয়ে আগে প্রয়োজন পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতা। নির্দিষ্ট জলপথ নির্বাচন, নাব্যতা যাচাই, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং প্রতিবছরের নির্দিষ্ট তারিখে উৎসব আয়োজন করা যেতে পারে।

প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সমাজ, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, ক্রীড়া সংগঠন ও জনগণের সমন্বয়ে স্থায়ী আয়োজক কমিটি গঠন করা জরুরি। বাইচের সঙ্গে সারি-ভাটিয়ালি গান, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, ঐতিহ্যবাহী নৌকা নির্মাণ প্রদর্শনী ও হাওরের জীবনচিত্র নিয়ে আয়োজন যুক্ত হলে এটি রূপ নিতে পারে পূর্ণাঙ্গ লোকসংস্কৃতি উৎসবে।

তরুণদের মাঝিমাল্লা হিসেবে প্রশিক্ষণ, পুরোনো নৌকা নির্মাণকারীদের সহায়তা এবং প্রবীণ মাঝিদের অভিজ্ঞতা সংরক্ষণও প্রয়োজন।

তবে উৎসবের আগে নিরাপত্তা। লাইফ জ্যাকেট, উদ্ধারকারী নৌকা, চিকিৎসা দল, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক ও নিয়ন্ত্রিত নৌযান চলাচল নিশ্চিত না করে বড় আয়োজন করা উচিত নয় বলে সচেতন মহল মনে করেন। স্থানীয়দের অভিপ্রায় থেমে থাকা বৈঠা কি আবার উঠবে?

নিকলীর হাওরের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু পানি নয়—পানি ঘিরে গড়ে ওঠা মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতির দৃশ্যমান প্রতীক নৌকা বাইচও।

আজ হাওরে পর্যটক আসে, নৌকা চলে, প্রকৃতি মানুষকে টানে; অথচ বৈঠার ছন্দ নেই। এই শূন্যতা পূরণ করতে পারলে নৌকা বাইচ শুধু পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনবে না, নিকলীর পর্যটন অর্থনীতিতেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

প্রশ্নে সুরে অনেকের জানতে চাওয়া দেখভালের দায়িত্বে থাকাদের পাশাপাশি প্রশাসনের কাছেও —হাওরের জলকে কি শুধু নৌভ্রমণের দৃশ্য হিসেবে রাখা হবে, নাকি সেই জলেই ফিরবে বৈঠার ঝড়?

কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন ‘ হাওরের নৌকা বাইচ হারিয়ে গেলে হারায় শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়; হারায় মাঝির দক্ষতা, নৌকার কারিগরি, সারি গানের সুর, সামাজিক মিলন আর একটি জনপদের নিজস্ব পরিচয়ের অংশও’।

নিকলী উপজেলার গুরই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান আবু তাহের বলেন, আমি এই বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে একাধিক মহলে কথা বলে চলেছেন। আফসোসের সুরে তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় এখন আর আগের মতো ততটা নৌকা তৈরির উদ্যোগ হাওরবাসীর মাঝে নেই। এমনকি খুব কম বলে জানান। যদিও তার এলাকায় একটি নৌকা এখনো রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। তবে তার অভিপ্রায় ‘অতীতের এই ঐতিহ্য হাওর বাসীর মাঝে ফিরে আসুক’।

নিকলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি বদরুল মোমেন মিঠুকে ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে দলীয় বিএনপির বেশ কিছু স্থানীয় নেতৃবৃন্দ অতীতের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এই বিষয়টির উপর গুরুত্ব বিবেচনায় দাবি তোলেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কিশোরগঞ্জ-৫, (নিকলী-বাজিতপুর) আসনের বিএনপির দলীয় প্রতীকের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সৈয়দ এহসানুল হুদার সাথে এই বিষয়ে কথা হলে নানাবিধ রাজনৈতিক দলীয় সুবিধা বঞ্চিতের কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি আপাতত এই বিষয়ে তার কাছে এই ধরনের উদ্যোগের খবর নেই বলেও উল্লেখ করেন।

এই বিষয়ে নিকলী উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা রেহেনা মজুমদার মুক্তির সাথে কথা হলে তিনি জবাবে জানান, স্থানীয়ভাবে যদি সেই ঐতিহ্য ধরে রাখার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন তাহলে হয়তো কর্তৃপক্ষের বিষয়টি বিবেচনা করে দেখার সুযোগ রয়েছে। তবে এই বিষয়ে এ ধরনের উদ্যোগের বিষয় উঠে কখনো আসেনি স্থানীয় পর্যায় থেকে।

হাওরের জল যদি নিকলীর প্রাণ হয়, তবে নৌকা বাইচ তার বৈঠার ছন্দ। আর সেই ছন্দ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরণের উদ্যোগ আছে কি না তা জানতেই ১৩ আগস্ট দুপুরের পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের সরকারি নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হয়। অজানা কারণেই জবাব মিলেনি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd