আলি জামশেদ, কিশোরগঞ্জঃ কিশোরগঞ্জে ইপিআই টিকার ঘাটতি, উদ্বেগ বাড়ছে কাঙ্খিত স্বাস্থ্য সেবায়, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে মা ও শিশু। এই বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন টিকার ঘাটতির কথা স্বীকারের পাশাপাশি দ্রুত সকল টিকার সরবরাহ নিশ্চিতের আশ্বাস প্রদান করেন।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার ন্যায় কিশোরগঞ্জ জেলাতেও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) এর টিকার ঘাটতি দেখা দেওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন অভিভাবকরা। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে গিয়ে টিকা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন শত শত পরিবার। বিশেষ করে নবজাতক ও শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়েও।
নিকলী ও বাজিতপুরসহ আশেপাশের কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিক ঘুরে দেখা যায়, অনেক অভিভাবক শিশুদের কোলে নিয়ে সকাল থেকেই টিকা কেন্দ্রে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় টিকা না থাকায় তাদের খালি হাতেই ফিরে যেতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সময় ও অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে শিশুদের নির্ধারিত সময়ের টিকা না পাওয়ায় অভিভাবকদের মাঝে আতঙ্ক ও হতাশা বাড়ছে।
বাজিতপুর উপজেলার জাহাঙ্গীর আলম তার চার মাস বয়সী ছেলে সন্তানকে এখন পর্যন্ত নির্ধারিত টিকা দিতে পারেননি। একাধিকবার কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়েও টিকা না পাওয়ায় তিনি চরম উদ্বেগে রয়েছেন। তিনি বলেন,“শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য টিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বারবার ঘুরেও টিকা না পাওয়ায় আমরা খুব হতাশ। সন্তানকে রোগ থেকে নিরাপদ রাখতে না পারার ভয় সবসময় কাজ করছে।”
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরও অনেক অভিভাবক। তারা জানান, স্বাস্থ্যকর্মীরা টিকা সংকটের কথা জানিয়ে পরে আসতে বলছেন। কিন্তু কবে নাগাদ টিকা পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। জেলার বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইপিআই টিকার সরবরাহ কম রয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শিশুদের টিকা প্রদান সম্ভব হচ্ছে না। এতে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাহত হচ্ছে। স্বাস্থ্যসচেতন মহলের ভাষ্য, শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটলে হাম, পোলিও, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও নিউমোনিয়ার মতো বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ রোগের আশঙ্কা বাড়তে পারে। তাই দ্রুত টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে, দীর্ঘ অপেক্ষার পরও টিকা না পেয়ে হতাশ অভিভাবকদের একটাই প্রশ্ন–শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ সেবা কবে স্বাভাবিক হবে?
ইপিআই টিকা কর্মসূচি শিশু ও মায়েদের প্রাণঘাতী বিভিন্ন রোগ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি। বাংলাদেশে এই কর্মসূচির মাধ্যমে লাখো শিশু মারাত্মক সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা পাচ্ছে। ইপিআই টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে অসংখ্য চিকিৎসক এর নানাবিধ গুরুত্ব তুলে ধরেন। হাম, পোলিও, যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, হেপাটাইটিস-বি, টিটেনাসসহ নানা প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধ করে বলে উল্লেখ পায়। এ টিকা শিশুমৃত্যুর হার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি শিশুর শারীরিক ও মানসিক সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। গর্ভবতী মায়েদের টিটেনাস টিকা মা ও নবজাতককে সুরক্ষা দেয়। মহামারি আকারে রোগ ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করে। জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। বিনামূল্যে এ টিকা প্রদান করায় সাধারণ মানুষ সহজেই স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকে বলেও উল্লেখ পাওয়া।
বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এর অধীনে পরিচালিত ইপিআই কর্মসূচি বর্তমানে দেশের অন্যতম সফল জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃত। নিয়মিত টিকা গ্রহণের মাধ্যমে একটি শিশু সুস্থ, নিরাপদ ও রোগমুক্ত ভবিষ্যৎ পেতে পারে বলেও উল্লেখ পায়।
নিকলী উপজেলা ইপিআই টেকনোলজিস্ট মোহাম্মদ আবদুল্লাহর সাথে কথা হলে তিনি এ টিকার গুরুত্ব তুলে ধরেন। এক কথায় তিনি এই টিকার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন। পাশাপাশি এই বিষয়ে নিয়মিত তাদের প্রচার প্রচারণা অব্যহত রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন। তবে সারা দেশের ন্যায় নিকলীতেও ওপিভি টিকার ঘাটতির কথা স্বীকার করেন তিনি।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. অভিজিত শর্ম্মা ৯ এতে সন্ধ্যায় টিকার ঘাটতির বিষয়টি নয়া দিগন্তকে স্বীকার করেছেন। এক প্রশ্নের জবাবে অতীতের টিকার ঘাটতি পূরণ করছেন বর্তমানের টিকা দিয়ে এমন বাস্তবতা স্বীকার করেন। এছাড়াও পাঁচটি রোগের একটি টিকার ঘাটতির কথা স্বীকার করেন সুস্পষ্টভাবেই। আগামী এক মাসের ভেতরে কাভারেজ হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।