নিজেস্ব প্রতিবেদকঃ নিকলীতে বালু খেকোরা রাতের আঁধারে লুটে নিচ্ছে নদী তীরবর্তী ফসলি জমির বালিমাটি। বিকালে জমি দেখতে পেলেও রাত শেষে সকালে জমি যেনো নদীর সাথে মিশিয়ে দিয়েছে! দিবা লোকে বৈধ বলে ভরাট কার্যক্রমে লিপ্ত রয়েছে। এছাড়াও ননীর হাওরের ফসলি জমি থেকেও উত্তোলিত হচ্ছে বালিমাটি। অবৈধ ভরাটের ক্ষেত্রে বাধা দিলেই আইনের অজুহাতে বৈধতার পাশাপাশি হুমকি ধামকি এমনকি উল্টো হয়রানি! সচেতন মহলের ভাষ্য, আইনের সাথে আঁতাতেই হচ্ছে দিবানিশি এসব অপকর্ম। হাহাকার চরমে উঠেছে স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে, বুকে চাপা কষ্ট।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ঐতিহাসিক গোড়াউত্রা নদীর তীরবর্তী তোতারচর এলাকার ফসলি জমি থেকে রাতের আঁধারে লুটে নিচ্ছে বালু খেকোরা বালিমাটি। কৃষক হারাচ্ছে ফসলি জমি। কঠিন বাস্তবতায় দিবালোকে বৈধতা দেখাচ্ছে ভৈরব এলাকার সাম্প্রতিক বৈধ বালি মহালের অজুহাতেই। এসব অপরাধের নেপথ্যে থাকতে দেখা গেছে ক্ষমতাধর নেতাকর্মীদেরকে। ক্ষমতার মোহে আর প্রশাসনিক দুর্বলতায় প্রতিবাদের ভাষা অনেকখানিই স্তব্ধ। বালু খেকোদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে অনেকেই বিপদের মুখে পতিত হয়েছে বলে সরে জমিনে উঠে আসে। কৃষকদের বুকফাটা আর্তনাদ কেউ দেখে না! বিচারের আশায় হন্যে হয়ে ঘুরে বিভিন্ন মহলে।
নিকলী উপজেলার ৭নং ছাতিরচর ইউনিয়নের তোতারচর এলাকার নদী তীরবর্তী ফসলি জমি থেকে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ ফুট গভীর করে ড্রেজারের মাধ্যমে বালিমাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে একটি চক্র। বর্ষা মৌসুমের শুরুর দিক থেকেই এখানে বালি উত্তোলনের লক্ষ্যে বডি রাখতে দেখা গেছে। জানা গেছে, নিকলী ও বাজিতপুরের সীমান্তবর্তী গুরই ইউনিয়নের দৌলতপুরের আলমাস গংদের। ক্ষতিগ্রস্তরা আলমাসকে জিজ্ঞেস করলে তা অস্বীকার করে থাকেন। এমনকি স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা সেখানকার বালিমালি উত্তোলনের বিষয়ে জিজ্ঞাস করলে তারা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। এই লক্ষ্যে স্থানীয়ভাবে গুরই ইউনিয়নের বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ বেশ কিছু নেতাকর্মীদের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা নালিশ করেছেন বলেও জানা গেছে।
ছাতিরচর ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মালেক মিয়া ক্ষোভের ভাষার পাশাপাশি এক পর্যায়ে হতাশার সুরে বলেন, কার কাছে বিচার দিবো, কোথায় গেলে বিচার পাবো! বিকালে চরের ফসলি জমি আছে সকালে জমি নদী হয়ে গেছে! ১৫০ শতাংশ জমির মধ্যে ১২০ শতাংশ জমির বালি কেটে নদীতে পরিণত করেছে বলে উল্লেখ করেন। এই ১৫০ শতাংশ জমি তিনি পত্তন দিয়ে ৯০ হাজার টাকা চৈত্র মাসেই একজনের কাছ থেকে নিয়ে এসেছেন। এখন কিভাবে এর সমাধান হবে বলেও উল্লেখ করেন। এছাড়াও তার চাচাতো ভাই আবুল কাশেমের সমবন্টনের ১৫০ শতাংশ জমি সম্পূর্ণরূপে নিয়ে গেছে।
ছাতিরচর ৯নং ওয়ার্ডের কৃষক আরশ আলী হতাশায় বলেন, এখন দেশে যেনো আইন নাই! তার বাপের কেনা ৬০ শতাংশ জমি এখন বালু দস্যুরা কেটে নিয়ে গেছে। কোথাও বিচার পাচ্ছেন না। এলাকা থেকে বেশ দূরের হাওরে এই হাওরে চলে রাতে বালু তোলার কাজ। সকালে নিয়ে বাজিতপুর উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় স্টিল বোটে করে বিক্রি করে থাকে। বাধা দিলেও কাজ হয় না।
ছাতিরচর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও প্রভাবশালী নেতা পরশ মাহমুদ জানান, বালু খেকোরা খুবই প্রভাবশালী, ননী হাওরে তার ফসলি জমি থেকেও গতকাল ১০০শতাংশ বালিমাটি কেটে নিয়ে গেছে বলে ভাইয়ের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। ক্ষোভের ভাষায় এক পর্যায়ে স্থানীয় আইনের তদারকির অভাবেই তিনিও অনেকখানি দায়ী করে চলেছেন।
ছাতিরচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান চৌধুরী ওরফে ইয়ার খানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
গুরই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তোতা মিয়াকে এই বিষয়ে মুঠোফোনে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি এই বিষয়ের অভিযোগ সম্পর্কে শুনেছেন বলে স্বীকার করেন।
গুরই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবু তাহেরের সাথে এই বিষয়ে কথা হলে বালিমাটি কাটার অভিযোগটি ছাতিরচর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুক্তার ভাইয়ের মাধ্যমে জানার সাথে সাথেই সেখানকার দৌলতপুরের আলমাস ও আলীম উদ্দিনকে জিজ্ঞেস করেছেন বলে উল্লেখ করেন। এমনকি জবাবে তারা বাজিতপুর উপজেলার কৈলাগ ও কুকড়া রায়ের লোকেরা বালিমাটি উত্তোলনের সাথে জড়িত রয়েছে বলে জানান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী কৃষক বলেন, শতশত একর জমি থেকে এভাবে তোলা হচ্ছে বালিমাটি। এ চক্রের বিরুদ্ধে অনেকখানিই জীবনের নিরাপত্তার এবং নানাবিধ ভয় থেকে বাধা দিতে এমনকি তাদের বিরুদ্ধে মামলা মোকদ্দমা করতেও নারাজ। রাতের আঁধারে ২৮ অক্টোবর ১০ টার দিকে ড্রেজার দিয়ে হাওরের বুকে আবাদি জমি কেটে স্টীল বোটে করে বালিমাটি তুলে নেয়ার সময়কার একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও নয়া দিগন্তের হাতে রয়েছে। তবে সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানা গেছে।
গুরই ইউনিয়নের দৌলতপুরের আলমাসের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন, এক সময়ে তার একটি ড্রেজার নদীপাড়ে তার নিজের জমিতেই রাখা ছিলো। পাশাপাশি নিজের ১০০ শতাংশ জমির বালিমাটি বিক্রি করেছেন বলেও স্বীকার করেছেন। তবে এখন তিনি এসবের সাথে জড়িত নন বলে দাবি তোলেন। তাছাড়াও তিনি ঢাকায় রয়েছেন বলেও জানান। এক পর্যায়ে নৌপথের এই রাস্তা বিভিন্ন এলাকার বোর্ড ও ড্রেজার মালিকেরা চলাচল করে এবং তাও এর সাথে জড়িত থাকতে পারে বলেও ইঙ্গিত প্রদান করেন।
নিকলী উপজেলার নিবার্হী কর্মকর্তা রেহেনা মজুমদার মুক্তির সাথে এই বিষয়ে কথা হলে জবাবে উত্তোলনের বিষয়ে তার কাছে কোনো ধরণের অভিযোগ নেই। তবে উত্তোলন এবং অবৈধ বালিমাটি ভরাটের বিষয়ে তিনি খতিয়ে দেখবেন বলেও আশ্বস্ত করেন। এছাড়াও তোতারচর থেকে রাতের আঁধারে বালিমাটি কেটে ভৈরবের বালিমহালের কথা বলে দিনে চালিয়ে দেয়ার প্রাসঙ্গিক জবাবে উল্লেখ করেন, ইতিপূর্বে খবরের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি বৈধ রিসিট দেখতে পেয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন।