জনস্রোত নস্যাৎ করতেই পরিকল্পিত এ হামলা বলে দাবি সৈয়দ এহসানুল হুদার
নিজেস্ব প্রতিবেদনঃ কিশোরগঞ্জ -৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনের হেভিওয়েট দুই প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মাঝে ব্যাপক সংঘর্ষ। গুলিবিদ্ধ ৪, আহত প্রায় শতাধিক। ৫০টির অধিক মোটর সাইকেল ভাংচুর, ৩০টি পিকআপ ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়াসহ একাধিক বিএনপির নেতাকর্মীকে অপহরণের অভিযোগ। গুরুত্বর আহতের খবরও মিলেছে সরেজমিনে।
২২ নভেম্বর বিএনপির সমর্থিত দুই নেতার কর্মসূচিকে ঘিরেই পূর্বপরিকল্পিত এই সংঘাত। প্রশাসনকে জানানো হলেও কাজে আসেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে একটি পক্ষ থেকে। সৈয়দ এহসানুল হুদার লোকেরা ৭ দিন আগের পূর্ব নির্ধারিত ঐতিহাসিক ডাকবাংলার মাঠে জড়িত হবার লক্ষ্যে বিকাল ৪টার মিটিংয়ে যাওয়ার সময়ে ইকবাল সমর্থকরা বাধা দিলে এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। একই দিনে ১২ টার দিকে বাজিতপুর পৌর উপজেলার অন্তর্গত ফায়ার সার্ভিস এলাকার, হিলোচিয়ার ইউনিয়নের জুমাপুর ও তার কাছাকাছি মরাখলা মানববন্ধনের ডাক দেয় ইকবাল সমর্থকরা। সেই রাস্তা অতিক্রম করে হুদা সমর্থকরা বাজিতপুরের ডাক বাংলায় যাওয়ার পথে রাস্তাতেই এই ঘটনার সূত্রপাত। এ সময়ে সাবেক ছাত্রদল সভাপতি ও যুবদল নেতা আশরাফুল অপহরণ হন। পরে তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এ সময়ে গুলিবিদ্ধ হন সরারচরের যুবদল যুগ্ম আহ্বায়ক আনোয়ার, গুলিবিদ্ধ বিএনপি কর্মী শাহীন সহ আরও দুইজন। এছাড়াও বাজিতপুরের যুবদল নেতা ইমরান, রুবেল, অনেকেই গুরুতর আহত হন। নিকলীর ইকবাল হোসেন জানান, প্রথমে তার মোবাইল চেক করে হুদার ছবি দেখতে পেলে বেদরক পিঠায় এবং এন্ড্রয়েড ফোন নিয়ে যায়। এই সময়ে ককটেল বিস্ফোরণ হয় এবং গুলাগুলির ব্যাপক শব্দ শুনেও আতঙ্কে থাকেন।
৩ নভেম্বর ৩০০ আসনের মধ্যে ২৩৭টি আসন বিএনপির প্রার্থীদের মাঝে বন্টন করা হলেও কিশোরগঞ্জের ৬টি আসনের মধ্যে ৪টি আসনের বিএনপির প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হয়। (কিশোরগঞ্জ সদর-হোসেনপুর) ১নং আসনের এবং (নিকলী-বাজিতপুর) ৫নং আসনের বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের নাম এখনো ঘোষণা করা হয়নি। এই দুই আসনের মধ্যে বাজিতপুর আসনের একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থীকে ঘিরে মাঠে আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে ব্যাপক আকারে। আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনকে ঘিরে নিয়মিত কর্মসূচিও পালন করতে দেখা গেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ হাওরের প্রবেশদ্বার নিকলী ও বাজিতপুরের বেশ কিছু বিএনপির মনোনয়নের দাবিদার এবং যোগ্যদের মধ্যে অন্যতম ভূমিকায় রয়েছেন বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল। ইকবাল ২০০১ সালে মনোনয়ন পেয়েও একাধিক বারের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক প্রয়াত মজিবুর রহমান মঞ্জুর জনপ্রিয়তার কাছে মনোনয়ন হারান। অপরদিকে শক্তিশালী এবং জোড়ালো ভূমিকায় রয়েছে ১২ দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়ক এবং বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদা। দুই জনের বাড়িই বাজিতপুর উপজেলায়। বিএনপি নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালের বাড়ি সরারচর ইউনিয়নের সরারচরে এলাকায়। অপর দিকে সৈয়দ এহসানুল হুদার গ্রামের বাড়িও দিলালপুর ইউনিয়নের মোল্লা পাড়ায়। যদিও শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল দীর্ঘদিন ধরে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করে চলেছেন। তাকে ঘিরেও রয়েছে বিএনপির একাংশের ক্ষোভ। তবে তার সমালোচনারও নেই কোনো কমতি। বিপরীতে শক্তিশালী ভূমিকায় থাকতে দেখা গেছে জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নের আশাবাদী সৈয়দ এহসানুল হুদাকে। দুই জনেই আসন্ন নির্বাচন ঘিরে ধানের শীষের পক্ষে ব্যাপক প্রচার প্রচারণায় রয়েছেন। প্রচার প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন ধরেই টানটান উত্তেজনা বিরাজমান রয়েছে দুই উপজেলার বুকে। জানা গেছে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থা ছিলো বাজিতপুরের বুকেই। বাজিতপুরে বিএনপির কমিটি নিয়েও ছিলো একাধিক গ্রুপিং। সে ক্ষেত্রেও সুযোগ পেয়ে বসে সৈয়দ এহসানুল হুদা। প্রচার প্রচারণায় তার জনবল দিনদিনই বাড়তে। যদিও শুরুর দিকে ততটা ছিলো না। দলীয় বিএনপির গ্রিন সিগন্যাল নিয়ে মাঠে নেমেছে সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন এ নেতা। মিশুক স্বভাবের এ নেতা অনেকখানি আস্তা অর্জন করতে পেরেছে বলে সাধারণ ভোটারদের বড় একটি অংশের মতামত। তবে একাংশের সমালোচনাও রয়েছে তিনি অনেকখানিই সরাসরি বিএনপির নেতা নন বলে।
সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, দুই পক্ষেরই পূর্ব নির্ধারিত দলীয় কর্মসূচি ছিলো। সেক্ষেত্রে ইকবালের পক্ষে নিকলী ও বাজিতপুরে নির্ধারিত স্থানে মানববন্ধনের কর্মসূচির সময় ছিলো দুপুর ১২টার দিকে। অপরদিকে হুদাও ধানের শীষের পক্ষে প্রচারণা চালান একই দিনের বিকাল বেলায়। ডাকবাংলায় জড়ো হওয়ার লক্ষ্যে সৈয়দ এহসানুল হুদার লোকেরা সেই মোতাবেক হিলোচিয়া ইউনিয়নের সরিষাপুরের কাছাকাছি মোড়ে গেলে ইকবালের লোকদের বাধার মুখে পড়ে। এতে শতাধিক হুদার লোক আহত হন বলে জানান তার সমর্থকরা।
এ ধরণের ঘটনায় সাধারণ ভোটারদেরকে মাঠে -ঘাটে, হাটে- বাজারে, চায়ের স্টলে বলতে শোনা গেছে, নিকলী বাজিতপুরের নির্বাচনের আগেই এই অবস্থা, ভবিষ্যতে জানি কি হয়! এমন ভীতিকর তথ্য কথাও উত্তেজনাময় পরিস্থিতির কারণেই উঠে আসে।
সৈয়দ এহসানুল হুদার সাথে, মুঠোফোনে কথা হলে এক বাক্যে উল্লেখ করেন, ঘটনার সময় বিকালে ইকবালের কোনো প্রোগ্রাম ছিলো না। মূলত তার জনস্রোত নস্যাৎ করতে পরিকল্পিতভাবেই বাধা দিয়ে রাস্তায় এমনটি করা হয়েছে। পূর্ব ইঙ্গিতের প্রেক্ষিতে নিবার্হী কর্মকর্তাকে এই বিষয়ে জানালেও কাজে আসেনি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার সমর্থকদের মধ্যে ৪জন গুলিবিদ্ধ, ২জন মিসিং, ২ঘন্টা পরে আহত অবস্থায় ১জনকে উদ্ধার, শতাধিক আহতের পাশাপাশি ৫০টি মোটর সাইকেল ও ৩০টি পিকআপ ভাঙচুর করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। বিএনপি এবং তার কর্মী-সমর্থকদের উপর হামলার হামলার তিব্র নিন্দা জানান এবং কঠিন বিচারেরও দাবি জানান।
শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের সাথে সন্ধ্যা ৬টা বাজে ৩৭ মিনিটে তার ব্যক্তিগত দুইটি নম্বারে ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
বাজিতপুর উপজেলার নিবার্হী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম সোহাগ এক প্রশ্নের জবাবে হুদা সাহেবের সাথে তার কথা হয়েছে বলে স্বীকার করলেও কেনো এমনটি হয়েছে এমন জবাবে সেখানে, ম্যাজিস্ট্রেট, অ্যাডিশনাল এসপি, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্য, ওসিসহ থানা পুলিশ অবগত ছিলেন বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি সব থাকা সত্ত্বেও কেনো এমনটি হলো আর বিশৃঙ্খলার দায় কার? এমন প্রশ্নের জবাবে খতিয়ে দেখে জানাবেন বলেও উল্লেখ করে। এছাড়াও তার কাছে অপহরণের কোনো তথ্য এবং অভিযোগ নেই বলে জানান।