নিকলীতে নামে ৫০ শয্যা হাসপাতাল হলেও কামে নাই!
নিজেস্ব প্রতিবেদনঃ নিকলীতে অ্যাম্বুলেন্সের চালকের অভাবে সিএনজি যোগে মুমুর্ষ রোগীকে জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে রাস্তায় মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নিহতের স্বজন।
নিকলী সদর হাসপাতালের সেবার মান নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগ দীর্ঘদিন থেকেই। জনবল সংকট থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামাদিরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ সেবা প্রত্যাশীদের। সেখানে নামে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল হলেও কাজের বেলায় নেই বলে উল্লেখ করেন। কিশোরগঞ্জের নিকলীতে নামে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল থাকলেও কাজে আসেনি স্থানীয়দের। জনবল সংকট ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদির অভাবসহ নানাবিধ অনিয়মের মধ্যে দিয়ে চলে হাসপাতালটি।
নিকলী সদর উপজেলার পাঁচরুখী গ্রামের রবিন কিং নামের এক যুবক তার ফেসবুক আইডিতে উল্লেখ করেছেন গত ১৮ নভেম্বর রাত আনুমানিক ৮ টার দিকে তার ৬০ উর্ধ্বের চাচা কৃষক আলাল উদ্দিন সড়ক দূর্ঘটনায় গুরুতরভাবে আহত হন। চিকিৎসার লক্ষ্যে তাকে দ্রুত নিকলী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক রোগীর অবস্থা বেগতিক দেখলে স্বজনদেরকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে পরামর্শ প্রদান করেন। এই সময়ে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার লক্ষ্যে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হলে চালক না থাকার কথা জানান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। স্বজনের দেয়া তথ্যমতে, সিএনজি যোগে নেওয়ার পথে সময় ও সেবার ভোগান্তির শিকারে রাস্তাতেই রোগীর মৃত্যু হয়। হতাশার বাক্যে এমন তথ্য ভাইপো রবিন কিং তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে উল্লেখ করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকখানিই দোষারোপও করে চলেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকের তদারকির এই অবহেলাকে। এছাড়াও ইতিপূর্বে বহু অভিযোগের তথ্য মিলে অ্যাম্বুলেন্স সেবার মানের অনিয়ম প্রসঙ্গে। তবে সেখানকার দায়িত্বে থাকাদের ভাষ্য, তিন দিন আগে অবসরে চলে গেছেন আরজু নামের অ্যাম্বুলেন্স চালক।
সরেজমিনে অনুসন্ধান ভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে জানা গেছে, ২১৪.৩৯ বর্গকিলোমিটারের কিশোরগঞ্জের অতি প্রাচীন নিকলীর সেই জনপদের বসতিদের অধিকাংশরাই দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। এখানকার মানুষের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি এবং বর্ষা মৌসুমে মৎস্য আহরণ। কেটে খাওয়া ও দিনমজুর শ্রেণীর মানুষের সংখ্যাই তুলনামূলক অনেক বেশি। হাওরের প্রবেশদ্বার বলে খ্যাত ঘনবসতিপূর্ণ অনুন্নত এই এলাকায় সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে তেমন একটা সুযোগ মিলেনি মৌলিক মানবিক চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ উন্নত স্বাস্থ্য সেবার সুযোগের ক্ষেত্রে। দীর্ঘদিন থেকেই হাওর বেষ্টিত নিকলীবাসীর সীমাহীন অভিযোগ রয়েছে কাঙ্খিত সেবা না পাওয়ার কারণে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিকলী উপজেলা সদরের ষাটধার এলাকাতে ১৯৮৩ সালের প্রথমদিকে ভারত চন্দ্র সাহা নামের এক ব্যক্তি ডিসপেনসারি হিসাবেই স্থানীয়দের উদ্দেশ্যে একটি স্বাস্থ্যসেবা চালু করে। পরে ১৯৮৩ সালে থানা হিসেবে স্বীকৃতির পরবর্তী পর্যায়ে এর কার্যক্রম শুরু হয় এবং হাসপাতালে রূপান্তরিত হয়। এই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় রোগীদের সার্বিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে হাসপাতালটিকে পর্যায়ক্রমে ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে শুরু হয় ৩১শষ্যায় রূপান্তরিতের কাজ। পরবর্তীতে ২০২৩ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে এবং ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দের প্রথমের দিকে এটিকে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে পৃথক ভবনে পরিণত করা হয়। তবে স্থানীয়দের ক্ষোভের ভাষ্য, ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও সেখানে এখনো মিলেনি কাঙ্খিত সেবা কার্যক্রম। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গাইনি ডাক্তার না থাকায় সেখানে এখনো মিলেনি প্রসূতিসেবা কার্যক্রম। শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারতো বহু দূরের কথা সেখানে ডাক্তার সোহাগ মিয়া, ডাক্তার হুমায়ুন কবির, ডাঃ তানজিনা আফরিন ও ডাঃ শরিফ, ডাঃ তানজিনা আফরিন, ডাঃ পরাগসহ স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সজীব ঘোষকে দিয়েই চলে হাসপাতালটি। সেখানে ডেন্টাল ডাক্তার থাকলেও কার্যক্রম নেই বললেই চলে। টেকনোলজিস্টের অভাবে বন্ধ সয়ে আছে এক্সরে মেশিনও।
ইতিপূর্বে উর্ধ্বতনদের আগমনের পাশাপাশি বহু রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশের দিকে কার্যকরী পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়ে গেলেও মিলেনি ফলপ্রসূ উন্নয়ন। তবে ১০ অক্টোবর বর্তমান স্বাস্থ্য সচিবের আগমন উপলক্ষে এখনো আশাবাদী রয়েছেন উন্নয়নের লক্ষ্যে। তাছাড়াও এখানকার সেবার মানের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রয়েছে সেবা নিতে আসা রোগীদের নানাবিধ অনিয়মের অভিযোগ।
জরুরী রোগীদের ক্ষেত্রে অভিযোগের চিত্র ব্যতিক্রমী হয়ে উঠার অন্যতম কারণ হলো রাস্তার ভোগান্তি। হাওরের অবহেলিত মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি জনস্বার্থে হাসপাতাল ও সেখানকার রাস্তার দিকে নজর দেয়া হলেই সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে অনেকটা সহায়ক হবে।
ডাঃ সজিব ঘোষের কাছে অ্যাম্বুলেন্সের সমস্যার কারণ এবং রোগী মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে প্রশ্ন রাখতেই, মৃত্যু ঘটনার খরব তার জানা নেই বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ৩দিন আগে চালক আরজু মিয়া অবসরে গেছেন বলেও জানান। এই বিষয়ে উপর মহলেও কথা বলেছেন বলে দাবি তোলেন। তবে অল্প সময়ের মধ্যে সেবার লক্ষ্যে চালক পাবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। ইতিপূর্বেও তিনি একাধিকবার উল্লেখ করেছেন মান উন্নয়নের লক্ষ্যে চেষ্টার বিষয়ে তার কোনো ধরণের অবহেলা নেই।
হাসপাতাল পরিদর্শনের সময়ে স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমানও আশ্বস্ত করেছেন ‘হাওরের এই হাসপাতালের ডাক্তার নিয়োগ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নের কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে।