চাঁদাবাজি নাকি স্বার্থের দ্বন্দ্ব
জামশেদ ইবনে মুসলিমঃ নিকলীতে চেয়ারম্যান থাকাকালীন স্বামীকে নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যার শোকে শোকার্ত নারী এখনও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে।
কিশোরগঞ্জের নিকলীতে পূর্ব শত্রুতার পাশাপাশি প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে মারপিটে আহত ১৪, ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৩৫ লক্ষ টাকা। চলছে মামলার প্রস্তুতি। তবে অপর পক্ষের দাবি চাঁদাবাজির ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী ঘটনার সূত্রপাত।
নিকলী উপজেলার দক্ষিণের শেষ সীমানার পাড়া বাজিতপুর ও দৌলতপুর ব্রিজ সংলগ্ন সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম তাহের উদ্দিন ওরফে তাহুর বাড়িতে ৩ ডিসেম্বর সকল আনুমানিক ৯ টার দিকে এ নারকীয় তাণ্ডবলীলা ঘটে। পুরুষের পাশাপাশি সেখানে নারীও আক্রমণের শিকার হয়েছে। ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে আক্রমণের পাশাপাশি ব্যাপক ভাংচুর চালানো হয়েছে। এ সময়ে জাহাঙ্গীর (২২), আঃ ছাত্তার (৬৫), সাকিব (২২) ও পারভীন (৪৭) নামের ৪ জনকে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে গুরুতর আহত করে। তাছাড়াও আকাশসহ বাকী আরোও অন্তত ৯ জন রয়েছে স্থানীয় চিকিৎসাধীন। গুরুতর আহতদের তাৎক্ষণিক বাজিতপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদের মধ্যে ৬৫ ঊর্ধ্ব আব্দুস ছাত্তারের অবস্থা বেগতিক হলে তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
আক্রমণের শিকার যুবদল কর্মী আকাশ জানান, ২০০৬ সালে আক্রমণকারীদের অনেকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে প্রতিবাদী চাচাষ তাহুকে চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়েই দিবালোকে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় অনেকের কঠিন শাস্তিও হয়েছে। এবারও সকালের দিকে পূর্ব শত্রুতার জেরে আর নদী-নালা ইজারার পথে বাধা, ক্ষমতার অপব্যবহারের চেয়ারম্যান পরিবার বাধাগ্রস্ত হয়ে দাঁড়ালে চেয়ারম্যান পরিবারে পরিকল্পিতভাবে পিস্তলের গুলিতে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে চেয়ারম্যানের ঘরসহ অন্যান্য ঘরে ঢুকে থানা যুবদল সদস্য আলমাস ও প্রবাসী খোকনের নেতৃত্বে শতাধিক লোক নারকীয় তান্ডব চালায়। ঘটনার সময়ে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুটপাট করে এবং আসবাবপত্র ভাংচুর করে। ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ৩৫ লক্ষ টাকা। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা।
অপর দিকে বিএনপির নেতা আলমাসসহ অসংখ্য দৌলতপুরবাসী দাবি উল্লেখ করেন, অত্র এলাকায় ৪২০ জন প্রবাসীর নিজেস্ব উদ্যোগ একটি সমবায় সমিতি রয়েছে। এই সমিতির মাধ্যমে প্রতিবছর একাধিক স্টীল বোর্ড তৈরি করা হয়। এই বোর্ডে কাজ চলমান থাকা অবস্থায় অবৈধভাবে জাহাঙ্গীর ও আকাশসহ বেশ কিছু লোকেরা গত ২ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ৮ টার দিকে নৌ মিস্ত্রীদের কাছে ১০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে। শ্রমিকদের ভাষ্য, রাতে ২ লক্ষ টাকা নিয়ে যায়। এ জন্যে গ্রামবাসীসহ সমিতির সকল সদস্যরা জড়ো হয়। এক পর্যায়ে চাঁদাবাজি রুখে দিতে এমনটি করা হয়েছে বলেও স্বীকার করেন। তবে আইনের আশ্রয় না নিয়ে, আইন হাতে তুলে, আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে চেয়ারম্যান তাহুর ন্যায় এই পরিবারের অস্তিত্ব মুছে দিতেই এই পরিকল্পিত নাশকতা? এমন জবাবে স্থানীয় অধিকাংশরাই তখন চুপসে যান। অনেকে আবার তাহু হত্যাকাণ্ডকে তৎকালীন সময়ের বিএনপির দলীয় গ্রূপিংয়ের শিকার বলেও উল্লেখ করেন। তবে এখানকার কেউ তখনকার ঘটনায় জড়িত নাই বলে দাবি তোলেন। এছাড়াও এই সমিতির অধীনে খেলার মাঠসহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে বলে উল্লেখ করেন।
৩ ডিসেম্বর বিকালে স্টীলের নৌকা সম্মুখে প্রবাসী কল্যাণ সমবায় সমিতির সদস্য নুর উদ্দিনকে চাঁদাবাজি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেই বলেন, চাঁদাবাজির ঘটনা না ঘটলেও তারা খুবই জুলুম, নির্যাতন করে। তুচ্ছ ঘটনায় মারামারি করে।
পার্শ্ববর্তী এলাকার অসংখ্য সাধারণ মানুষের সাথে কথা হলে জানা যায়, রাতে মিস্ত্রীদের সাথে ঝগড়ার ঘটনার বিষয়ে প্রাথমিক মিমাংসা হলেও পরদিন সকালে এ ঘটনা।
গুরই ইউনিয়নের প্রয়াত চেয়ারম্যান তাহুর স্ত্রী বলেন, তার স্বামীকেও ২০০৬ সালের ১০ অক্টোবরে দিবালোকে গুলি করে হত্যা করেছে অপরাধী চক্র। এবারও চক্রান্ত করে ছেলে জাহাঙ্গীরকে জীবনে মেরে ফেলার লক্ষ্যে আর লুটপাট করতেই এই ঘটনা ঘটিয়েছে। তার দুই ছেলে বিদেশ থেকে নিয়মিত টাকা পাঠায় আর হাওরে ৬০ খানি জমি রয়েছে কোন দুঃখে তার ছেলে চাঁদাবাজি করতে যাবে। এসব কিছু সাজানো অভিযোগ আর পরিকল্পিত বলে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
নিকলী থানার অফিসার ইনচার্জ, মো. আনোয়ার হোসেন এক প্রশ্নের জবাবে জানান, ঘটনা সম্পর্কে তিনি অবগত এবং জানামতে চেয়ারম্যান পক্ষের মামলার প্রস্তুতি চলছে। তাছাড়াও বিষয়টি নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণে রয়েছেন বলে ইঙ্গিত প্রদান করেন।