ক্যাপশনঃ গুলিবিদ্ধ, ভাংচুর, আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেফতার ২২, উত্তেজনা বিরাজমান
নিজেস্ব প্রতিবদকঃ বাজিতপুরে আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেফতার ২২, পরিস্থিতি অবজারভেশনে স্থানীয় নেতাকমীসহ বিভিন্ন মহল। চলছে নানামুখী বিবৃতি। যে কোনো মুহূর্তে রয়েছে সহিংসতার আশঙ্কা। সাধারণ ভোটারদের বড় একটি অংশের ভাষ্য, মনোনয়ন নিয়েই এই অবস্থা নির্বাচন এবং নির্বাচিত হলে জানি কি অবস্থা হয়। জেলা পর্যায়ের সর্বোচ্চ মহলের প্রশাসনিক নজরও এখন বাজিতপুরের দিকেই। দুই উপজেলার বিক্ষিপ্ত স্থানে ছড়িয়ে পড়তে পারে দলীয় সংঘাত। গুঞ্জন উঠেছে অস্ত্রের ঝনঝনানির বিষয়েও। জনমনে বিরাজ করছে আতঙ্ক।
আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জ -৫, আসনে মনোনয়নের দৌড়ঝাঁপ থেকে শুরু করে দলীয় গ্রুপিং আর হিংসাত্মক আচরণের ফলশ্রুতিতে যে কোনো সময়ে ঘটে যেতে পারে বিএনপির নিজেদের মধ্যেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। একেকটি নারকীয় তাণ্ডবলীলা জন্ম দিচ্ছে ভীতিকর পরিস্থিতির। তাই স্থানীয় শান্তিপ্রিয় সর্বসাধারণ তাদের শান্তির লক্ষ্যেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ উপর মহলের শীর্ষ নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে চলেছেন। এই আসনে বিগত সময়ের আওয়ামী ফ্যাসিস্টের ন্যায় যাতে নতুন করে কেউ কোনো জুলুমের শিকার না হন এমন সৎ, আদর্শবান, বিনয়ী, শিক্ষিত, নম্র, ভদ্র, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন, দক্ষতা ও জ্ঞান গরিমায় ভরপুর, এমন ব্যক্তির মনোনয়ন আশা করেন। যার কাছে সাধারণজনগণ নিরাপদে থাকবে, তাদেরকেই যেনো দেয়া হয় ধানের শীষের মনোনয়ন। এই আসনটি অতীতের বিএনপির দুর্গ বলে খ্যাত। ধানের শীষের মনোনয়ন নিলেই হবে নিশ্চিত এ আসনের কর্ণধার।
৩ নভেম্বর ৩০০ আসনের মধ্যে ২৩৭টি আসন বিএনপির প্রার্থীদের মাঝে বন্টন করা হলেও কিশোরগঞ্জের ৬টি আসনের মধ্যে ৪টি আসনের বিএনপির প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হয়। বাকী থাকে কিশোরগঞ্জের -১ ও কিশোরগঞ্জ -৫ ।
ভৌগলিক অবস্থানসহ নানান দিক বিবেচনায় কিশোরগঞ্জ -৫, নিকলী ও বাজিতপুরের এই আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়ে উত্তাল, টালমাটাল। আতঙ্ক বিরাজ করছে জনমনে। ধানের শীষের প্রচারণাকে কেন্দ্র করে গুলিবিদ্ধ ৪ যুবদল নেতা, আহত শতাধিকের পাশাপাশি অসংখ্য গাড়ী ভাংচুর। অপহরণের মতো নারকীয় পরিস্থিতির কারণেই ঘটনার মোড় কোন দিকে নিবে তা নিয়েই ভাবছেন স্থানীয় জনগণ।
গত ২২ নভেম্বর, বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ইকবাল হোসেন এবং ১২ দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়ক এবং বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদার পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচিকে ঘিরেই এসব ঘটনার সূত্রপাত। ঘটনাটি জনস্রোত নস্যাৎ করার লক্ষ্যে পূর্ব পরিকল্পিত বলে দাবি সৈয়দ এহসানুল হুদার। পূর্ব ইঙ্গিতের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় প্রশাসনকেও অবগতও করা হয়েছিলো বলে তিনি উল্লেখ করেন। তৎসত্ত্বেও শেষ রক্ষা অনেকাংশেই সম্ভব হয়ে উঠেনি বলেও তিনি ক্ষোভের ভাষায় মন্তব্য করেন। যদিও আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকারা যুক্তি তুলে ধরছেন বিভিন্ন দিক বিবেচনায়, ভিন্ন আঙ্গিকে।
সরেজমিনে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায়, ২২ নভেম্বর মনোনয়ন প্রত্যাশী শেখ মজিবুর ইকবালও পূর্ব নির্ধারিত তারিখ ও সময় অনুযায়ী ১২ টার দিকে পৌর এলাকার ফায়ার সার্ভিস মোড়ে, হিলোচিয়ার জুমাপুরের কাছাকাছি মরাখলায় মানববন্ধন করে। অপরদিকে বিকাল প্রায় সাড়ে চার টার দিকে সৈয়দ এহসানুল হুদার লোকেরা ডাকবাংলার মাঠে, ধানের শীষের পক্ষে প্রচারণার ডাক দেয়। ডাকবাংলাতে যাওয়ার সময়ে ইকবাল সমর্থকরা উল্লেখিত তিনটি স্থানে বাধা দিলে সহিংসতায় রূপ নেয়। এক পর্যায়ে এই নারকীয় ঘটনার জন্ম নেয়। যদিও ইকবালের দাবি তার সমর্থকদের উপরই হামলা চালানো হয়েছিলো। এছাড়াও ইকবাল সমর্থকদের দাবি মারামারির ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুনরায় আনুমানিক রাত ১০টার দিকে সৈয়দ এহসানুল হুদার লোকেরাই নাসকতার প্রস্তুতি নেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে সেনা সদস্যরা ঘটনার দিন রাতে একটি অভিযান পরিচালনায় নামলে আগ্নেয়াস্ত্রসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে হুদা সমর্থিত ২২ নেতা-কর্মীদেরকে আটক করে। এক পর্যায়ে থানায় সৌহার্দ্য করা হয়। এই বিষয়ে বাজিতপুর থানায় মামলা হয়। আটককৃত আগ্নেয়াস্ত্রধারীর পরিচয় মিলে তিনি বাজিতপুর উপজেলা যুবদলের একজন সক্রিয় সদস্য। তার পুরো নাম আবুল হাসনাত । নেতাকর্মীদের পরিচয় জানা যায় ওরা প্রায় সকলেই বিএনপির সমর্থিত স্থানীয় নেতা-কর্মী। তবে অনুসন্ধানী তদন্তে তথ্য মিলে ওরা একেকবার একেক নেতার পক্ষে অবস্থানকারী ভূমিকায়।
এই বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার সাথে কথা হলে বাজিতপুরের সার্বিক পরিস্থিতি অনেকটা ব্যতিক্রমী বলে তথ্য প্রদান করেন। তাছাড়াও ব্যতিক্রমী বলেই প্রশাসন অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে থেকে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে যৌথভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে তুলে ধরেন।
আতঙ্কে থাকা অসংখ্য শান্তিকামী জনগণকে বলতে শোনা যাচ্ছে কখনো তারা ইকবাল সমর্থিত বিএনপি নেতাদের উস্কানিমূলক ভাষণ লক্ষ্য করে চলেছেন আর কখনো হুদা সমর্থিত নেতাদের এই সব ভাষণ। এই আসনে কখন কি ঘটে এই দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে আতঙ্কিত। এমনকি অনেককেই বলতে শোনা গেছে তাদের এই আক্রমণাত্মক কথা ও কার্যকলাপের জন্যে দলের মনোনয়ন অন্য কারো ভাগ্যেও জুটে যেতে পারে।
কিশোরগঞ্জ -৫ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী সৈয়দ এহসানুল হুদাকে ঘটনার দিন বিকালে তার কর্মীসমর্থক এবং সর্বসাধারণের উদ্দেশ্যে অনেকখানি আবেগাপ্লুত এবং ক্ষোভের ভাষায় একটি ভিডিওতে ইকবাল এবং মনিরকে উদ্দেশ্যে করে বলতে শোনা গেছে, তারা যেনো তার দিকে চোখ না রাঙায়। তাকে তারা মারতে আসলে তিনি বেঁচে থাকলে একটাকেও বাঁচতে দিবে না। এক কথায় তাকে চোখ রাঙ্গাতেও বারণ করেছেন। এমনকি মারতে আসলে নিজের খবর খুঁজতে হবে। এমন উত্তেজিত বক্তব্যের ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে ভাইরাল। তবে তিনি মুঠোফোনে একাধিকবার জানান, স্থানীয় প্রশাসনের কাছে তিনি সহযোগিতা চেয়েও অনেকাংশে ব্যর্থ হয়েছেন বলে। তার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে বলেও দাবি তোলেন।
অপরদিকে শেখ মজিবুর রহমান ইকবালকেও এক ভিডিও বক্তব্যে চমৎকার বাচনভঙ্গিতে ঠান্ডা মাথায় বলতে শোনা গেছে, তার লোকজনকে মারতে আসা হুদার পক্ষের লোকেরা সব আওয়ামীগের লোকজন। হুদা তার দলের কেউ না। তার দলের নিবন্ধন পর্যন্ত নাই। তারেক রহমান অত্যন্ত বিচক্ষণ। তিনি এবং তার নেতারা বিবেক বিবেচনা করে তাকেই মনোনয়ন দিবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন। মহান আল্লাহর দরবারে সাহায্যও কামনা করেন এ সময়ে। তবে তার সাথে একাধিক সময় মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ সম্ভব হয়ে উঠেনি।
বাজিতপুর উপজেলার দায়িত্বে থাকা ক্যাম্প কমান্ডারের সাথে কথা হলে, সেদিন যৌথবাহিনীর অপারেশন ছিলো বলে উল্লেখ করেন। পূর্বপরিকল্পিত খবরে এমনকি গ্রেপ্তারকৃতদের উদ্দেশ্যেও তারা সেখানে যাননি বলে জানান। তবে রাজনৈতিক দলের পরিচিতি বিবেচনায় এনে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। তাদের সামনে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে যে সব অপরাধী পড়েছে আর অপরাধী হিসেবেই সন্দেহ হয়েছিলো বলেই তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার পরবর্তীতে তাদেরকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানান। এছাড়াও অধিক তথ্য জানতে থানায় যোগাযোগেরও পরামর্শ প্রদান করেন।
বাজিতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোরাদ হোসেন ও জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী, বিপিএমকে ২৪ নভেম্বর একাধিকবার ফোন করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। তবে বাজিতপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তৃপ্তি মন্ডলের সাথে কথা হলে নিরপেক্ষভাবে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার লক্ষ্যে প্রাণপণে চেষ্টা করে চলেছেন বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ২২ নভেম্বরের ঘটনায় যৌথবাহিনীর সোচ্চার থাকার বিষয়ও উল্লেখ করেন। তবে বিক্ষিপ্ত স্থানের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে তার চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই বলেও জানান। সব সময়ে অতিরিক্ত পুলিশ রাখা অনেকখানি কষ্টসাধ্য উল্লেখ করে এক পর্যায়ে বলেন, যখনি কোনো বিশৃংখলার পূর্ব ইঙ্গিত মিলে তখনি তিনি জেলায় অতিরিক্ত পুলিশ চান। এছাড়াও জেলা পুলিশ সুপারও যথাসাধ্যভাবে পুলিশ দিয়ে যাচ্ছেন বলে উল্লেখ করেন। ২২ নভেম্বর, ২২ জনকে যৌথ অভিযানে চালিয়ে সেনা সদস্যরা অপরাধী বিবেচনা করেই ধরেছেন বলে জানান। এটা কোনো দলীয় বিষয় নয় বলে উল্লেখ করেন। তাছাড়াও তারা কোনো দলের পক্ষ হয়ে নন বরং অপরাধ দমনই তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বলে ইঙ্গিত প্রদান করেন।