নিজেস্ব প্রতিবেদনেঃ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয় সাম্প্রতিক নিকলীতে। সেই ভারী বর্ষণে ডুবে গেছে হাওরে কৃষকের বুকভরা স্বপ্ন। বেড়েছে স্থানীয় হাওরে কৃষকের মাঝে হাহাকার। হাওরে উত্তোলিত ধানসহ বাথানে পশু নিয়েও বিপাকে স্থানীয়রা। অনুসন্ধানে উঠে আসে দায়ী অপরিকল্পিত বাঁধ ও নদী-নালা খননজনীত অভাব। সরেজমিনে চলেছে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত। একাধিক সচিবের ভাষ্য ক্ষয়ক্ষতির কারণ নিরুপনে চলছে মাঠ পর্যায়ে জরিপ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে অনেককেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দেখা গেছে। তবে বাস্তবে সেই সহযোগিতা কতটুকু মাঠ পর্যায়ের প্রান্তিক কৃষকদের কাছে পৌঁছবে এই নিয়েও অনেকের মাঝে কৌতুহল জেগেছে। তবে এখনো কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ হয়নি।
কিশোরগঞ্জ ও তৎসংলগ্ন হাওরাঞ্চলের কৃষকদের বাৎসরিক অন্যতম আয়ের ভরসা বোরো ফসল। অনেকেই লাভের আশায় ধারদেনা করে ঠান্ডা-গরম উপেক্ষা করে দিবানিশি হাওরে ব্যস্ত সময় কাঁটায় বোরো ফসল ঘরে তোলার লক্ষ্যে। বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে অধির আগ্রহে বসে থাকে সেই কাঙ্খিত সোনালী ধান বিক্রি করে ধারদেনা পরিশোধ করে সংসারের অভাব ঘুচিয়ে সুখে সময় কাটানোর আশায়। এই ভবিষ্যতের স্বপ্ন সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণে ধূলিসাৎ হতে চলেছে। ডুবে গেছে হাজার হাজার একর ফসলি জমির ধান। হাওরে এখন কৃষকের আহাজারি। ডুবে গেছে কৃষকের সকল রঙিন স্বপ্ন।
গত প্রায় ৩দিনে প্রবল বর্ষণে দেশের কয়েকটি নদ-নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। স্থানীয় আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে গত ২৮ এপ্রিল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় নিকলীতে। প্রথম শ্রেণীর স্থানীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের আকতার ফারুকের দেয়া তথ্যমতে গত ২৮ এপ্রিল ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় নিকলীতে।
সেই পরিপ্রেক্ষিতে সুনামগঞ্জের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় নদ-নদী খননের অভাব আর অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের ফলে ভারী বর্ষণে যেমন জলাবদ্ধতা বেড়েছে সেই সাথে উজান এলাকার সীমান্তবর্তী পাহাড়ী এলাকার ঢলের পানিও ভারতের মেঘালয় ও আসাম অঞ্চল থেকে আসার সাথে একাকার হয়ে একাধিক নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে। ফলে তলিয়ে যায় আশেপাশের হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল। কোথাও পানি গলা সমান কোথাও বুক সমান। ধানের খলা পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে গেছে। হার্ভেষ্টার মেশিনে কাজ হচ্ছে না, শ্রমিক সঙ্কট দেখা দিয়েছে, আধা কাছা ধান সঠিক মূল্যে বিক্রি ও করতে ফিরছেন না। খরচের চিন্তায় কৃষকের মাথায় হাত।
মূলত কয়েকটি আন্তঃসীমান্ত নদ-নদীর মাধ্যমে সুনামগঞ্জ হয়ে কিশোরগঞ্জের ঘোড়াউত্রার নিকটবর্তী হাওর এলাকায় পানি প্রবেশ করে। সেই অঞ্চলের প্রধান নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম সুরমা, কুশিয়ারা, যাদুকাটা, সারি ও ধলাই নদী। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢল প্রথমে যাদুকাটা, সারি ও ধলাইসহ ছোট-বড় অসংখ্য নদীতে নামে। এগুলো গিয়ে মিশে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে। এরপর এই দুই প্রধান নদীর শাখা ও প্রশাখা দিয়ে পানি সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে পানি ধীরে ধীরে নেমে আসে কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন হাওরে। বিশেষ করে ঘোড়াউত্রার মাধ্যমে হাওরে প্রবেশ করে। যা শেষ পর্যন্ত মেঘনা নদী অববাহিকায় গিয়ে মিশে। খননের অভাবে আর অপরিকল্পিত বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণের ফলে অধিক পরিমাণে প্রভাব ফেলেছে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনার পাশাপাশি কিশোরগঞ্জের অসংখ্য হাওরে। কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি অফিসের দেয়া তথ্যমতে চলতি বছর কিশোরগঞ্জ জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এতে করে ১১ লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিকটন বোরো উৎপাদনের টার্গেট থাকলেও অফিসিয়ালি দাবি ৫৩ ভাগ কর্তন করা হয়েছে। তবে সরেজমিনে কৃষকদের দাবি আনুমানিক ২৫ ভাগ কাটা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ বিষয়ে সরেজমিনে উপ-পরিচালক (শষ্য) শাহিনুর রহমান ও জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনসহ একটি বিশেষ টিম মাঠ পর্যায়ে তদন্ত কাজে রয়েছেন বলেও জানান জেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. সাদিকুর রহমান।
সরেজমিনে জেলা বৃহৎ হাওরে জোয়ান শাহীতে গিয়ে দেখা গেছে অসংখ্য কৃষকের আহাজারির দৃশ্য। কেউ কেউ তলিয়ে যাওয়া আধা কাছা ধান কোনো রকমে দ্বিগুণ মূল্যের শ্রমিক দিয়ে দুই হাজার টাকা রোজে আধাকাটা অবস্থায় নৌকায় ভরাট করছেন। কেউবা পোষায়নি বলে ধানকাটার আশা পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছেন। অনেককেই দেখা গেছে বাথানে ঝড়োহাওয়ার কারণে গবাদি পশু ও বাথানে ঘর নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।
নিকলী উপজেলার দামপাড়ার কৃষক কামরুল ইসলাম জানান, হাওরে এবছর তিনি বছর ৩৬ একর জমিতে বোরো আবাদে করেছেন। এরি মধ্যে ২২ একর জমির ধান একেবারে তলিয়ে গেছে। আজ দ্বিগুণ দামে শ্রমিক নিয়ে ধান কাটার কাজে মাঠে নেমেছেন। ২৮ এপ্রিলের ঝড়ো বাতাসে তার বাথানের দু’চালা টিনের ঘর উড়িয়ে নিয়ে যায়। ৭ শ্রমিকের অনেকেই ক্ষুদ্র আকারে আঘাতপ্রাপ্ত হন। বাথানের ২০টি দেশী মোরগ আর ৩০টি হাঁস মারা গেছে বলে উল্লেখ করেন। বাথানে রাখা গবাদি পশু (গরু) ঝুঁকিতে। এছাড়াও মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে এমন দৃশ্য শুধু নিকলী উপজেলার বড় হাওরেই নয় বরং কিশোরগঞ্জ জেলা ও আশেপাশের জেলার অনেক হাওরের কৃষকদের এ দুর্দশা। বিভিন্ন স্থানে খবর মিলছে জমির কাচা-পাকা ধানসহ খলায় জমা রাখা উত্তোলিত ধান পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে গেছে, পানিতে পড়ে ধান নষ্ট হয়ে গেছে, কাটা ধান পর্যন্ত বৃষ্টিতে ভাসছে।
জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন এক প্রশ্নের জবাবে জানান, মাঠ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের লক্ষ্যে উপ-পরিচালক (শষ্য)সহ জেলা কৃষি কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি বিশেষ টিম মাঠে রয়েছেন। এই বিষয়ে পরবর্তীতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত করা হবে বলে জানান।
অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শষ্য) এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, গত ২৯ এপ্রিল ক্ষয়ক্ষতির তথ্য তার কাছে ৪ হাজার ৭৫৪ হেক্টর জমির রয়েছে। এছাড়াও ৩০ এপ্রিল বিকাল পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে জরিপ চলছে বলে জানান তিনি। সর্বশেষ তথ্য পাওয়ার পর তিনি আপডেট দিতে পারবেন বলেও উল্লেখ করেন।
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবুল হাসনাত হুমায়ূন কবিরকে ৩০ এপ্রিল দুপুর ২ টার কাছাকাছি সময়ে ০১৭১৫২২১৪৯৪ নম্বরে ফোন করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে অতিরিক্ত মহাপরিচালক জামাল হোসেনের সাথে কথা হলে এক প্রশ্নের জবাবে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নিরুপনের বিষয়টি নির্ধারণ করবে কৃষি অফিস। তবে তাঁরা সেই তথ্য তাদের কাছ থেকে যথাসময়ে পেয়ে যাবেন বলে উল্লেখ করেন। এছাড়াও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ প্রদান করেন।