এলাকাবাসীর ভাষ্য, নির্বাচন মুহূর্তে নেতারা আশা দিলেও পরবর্তীতে আর কাজ করে না!
বর্ষায় নান্দনিক ও দৃষ্টি নন্দন অপরূপ এক সৌন্দর্যের লীলা ভূমিতে পরিণত হয়ে উঠে নিকলী উপজেলা সদরের একটি অবহেলিত বদ্বীপ। সেখানে হাজারেরও অধিক লোকের বসবাস হলেও বর্ষায় একমাত্র ভরসা হয়ে উঠে ডিঙ্গি নৌকা। বৈরী আবহাওয়া আর ঝড়ো বাতাসের সময় হলেও শিশু শিক্ষার্থীরা থাকে ভয়ে। বিপাকে পড়ে বৈরী আবহাওয়ায় নৌকার পেলে। নেই গ্রামটিতে কোন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও। তুলনামূলক শিক্ষিতের হারও অতি নগন্য। এখানকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস বর্ষায় মাছ ধরা আর শুকানতে কৃষি কাজ করা। যোগাযোগ সুবিধা বঞ্চিত এই গ্রামের মানুষের প্রাণের দাবি যোগাযোগ বাড়াতে আর গ্রাম দুটোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ব্রীজের কোনো বিকল্প নেই। দুই গ্রামের যে কোনো স্থান দিয়ে ব্রীজ হলে এলাকাবাসীর দুঃখ ঘুচবে এমনকি সরকার নজর দিলে এই গ্রাম পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। বরাবরের মতো তারা এমনি যুক্তি ও দাবি তোলেন।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলা সদরের ৭নং ওয়ার্ডে সোয়াইজনি নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত জাফরাবাদ আর ৪নং ওয়ার্ডে অবস্থিত ভবানীপুর। সম্ভবত কোনো ঐতিহাসিক মুসলিম ব্যক্তি কিংবা স্থানের নামেই হয় থাকতে পারে এই জাফবাদ গ্রামের নামের উৎপত্তি। অপরদিকে ঐতিহাসিক সনাতন ধর্মীয় ব্যক্তির নামেই হয় থাকতে পারে সংলগ্ন ভবানীপুরের নামকরণ। যদিও এ তত্ত্বে কিছুটা মতভেদ রয়েছে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও এই গ্রামের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে নিঃসন্দেহে। প্রায় ২০০ শতাধিক বছরের পুরোনো এই গ্রাম। নিকলী উপজেলা সদরের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ সমাধিস্থলও এই ভবানীপুরেই অবস্থিত। আফসোসে এমনকি ক্ষোভের এই গ্রাম দ্বয়ের ভাষায় অনেককেই বলতে শোনা গেছে, এই পর্যন্ত সরকারী খরচে তেমন কোনো উন্নয়নমূলক কাজ হয়নি এই গ্রামে। যদিও তারা সরকারকে নিয়মিত ট্যাক্স দিচ্ছে, সরকারি নিয়ম মেনে চলছে। কিন্তু নদী ভাঙ্গন রোধেও কখনো দেখেননি তারা সরকারি বেসরকারি কোনো ধরণের উন্নয়নমূলক উদ্যোগ। এমন নিদারুণ বাস্তবতার কথাও তারা তুলে ধরেন।
এমনকি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই বলে তারা উল্লেখ করেন। এছাড়াও গ্রাম দ্বয়ের অনেকের সঙ্গে কথা হলে যোগাযোগ ব্যবস্থার বিষয়ে হতাশা ওয়চরম ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এমনকি যোগাযোগের এই দুরবস্থার কারণে অনেকেই পৈতৃক ভিটেবাড়ি ছেড়ে অন্য গ্রামে চলে গেছে বলে উল্লেখ করেন।
বিনোদন ও অভিনয়ের সাথে জড়িত নদীতীর সংলগ্ন জাফরাবাদের হৃদয় মাহামুদ বলেন, ২০২৪ সালের এইচএসসি আইসিটি পরিক্ষা দেওয়ার সময়ে নৌকা না পেয়ে অন্তিম মুহূর্তে সাতরে ১০০ মিটারের অধিক দৈর্ঘ্যের নদী পার হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রস্তুতি লগ্নে তার এক চাচা হাওর থেকে মাছ ধরে নৌকা নিয়ে বাড়ি এলে পরিত্রাণ ঘটে। তার মতো অনেক শিক্ষার্থীদেরকেই এমন ঘটনার শিকার হতে হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।
জাফরাবাদ গ্রামের বাসিন্দা আসাদুজ্জামানের সাথে সাংবাদিকদের একাধিকবার কথা হলে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও, এই গ্রামের মানুষ আজও স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। সিরা দেশে কমবেশি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও,জাফরাবাদ গ্রামে কোনো উন্নয়ন হয়নি বলেও চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জাফরাবাদের বাসিন্দা চয়ন মাহমুদ দিদার আফসোসে বলেন, এই গ্রামে একাধিক জরুরী রোগীকে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বরণ করতে হয়েছে যোগাযোগের এ দুরবস্থার কারণে। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন স্কুলগামী ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের, মারাত্মক দুর্ভোগ পোহানোর বিষয়েও।
এই গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ৭০বছর বয়সী কারার আহেদ আলী উল্লেখ করেন, নির্বাচন এলেই অনেকেই ছুটে আসে, আমাকে ভোট দেন, ব্রীজ করে দেবো, পায়ে হেঁটে চলার রাস্তা করে দেবো। কিন্তু নির্বাচন চলে গেলে আর আসে না!
তিনি আফসোসের সহিত বলেন, মৃত্যুর আগে ব্রীজ দেখে গেলে মরেও শান্তি পাইতাম।
রাষ্ট সংস্কার আন্দোলন নিকলী উপজেলা ইউনিটের সদস্য সচিব মাশুকুর রহমান ঝুটন জানান, ছোট বেলা নৌকা যোগে জাফরাবাদ যাইতাম। স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও এই গ্রামে কোনো রাস্তা হয়নি।
নিকলী সদর ইউনিয়ন বিএনপির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ও ৭নং ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার আল মামুন বলেন, জাফরাবাদ একটি অবহেলিত গ্রামের নাম। গ্রামবাসীদের নিয়ে, কতৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে চলেছি। সাইটধার অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের কৃষি জমি জাফরাবাদ হাওরে। সাইটধার হতে জাফরাবাদ ব্রীজটি নির্মাণ হলে, কৃষির সাথে জড়িতসহ স্থানীয়দের উপকার হতো।
নিকলী সদর ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান প্যানেল চেয়ারম্যান হুমায়ুন এক প্রশ্নের জবাবে কবির বলেন, জাফরাবাদ একটি অনুন্নত গ্রাম। একটি ব্রীজ গ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। উপজেলা নিবার্হী অফিসার মহোদয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আগামী মাসিক সভায় বিষয়টি তুলে ধরবো।