• বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৬ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা ও গুলির ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের নামে মামলা নিকলীতে বালু উত্তোলনের ঘটনাসহ পৃথক ঘটনায় নিহত –২ পর্যটন হাওরে গোসলে নেমে নিখোঁজ পর্যটক ২৪ ঘণ্টা পেরিয়েও মেলেনি সন্ধান, উদ্ধার অভিযান অব্যাহত হাওরে মাছ কমছে, প্রভাব পড়ছে কিশোরগঞ্জের শতবর্ষী শুঁটকি শিল্পে  নিকলীতে প্রবীণ আওয়ামীগ নেতা ও সাবেক ৪ বারের চেয়ারম্যান আজমল হোসেন গ্রেফতার  আবহাওয়ার আমূল পরিবর্তনের ফলে হাওরের জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ও জনজীবনে চ্যালেঞ্জ      হাওরে প্রবেশদ্বার এলাকায় দস্যুদের তাণ্ডব: শিশুকে হত্যা হুমকিতে লুটে নেয় আড়াই লক্ষাধিক টাকা হাওরাঞ্চলের চামড়া অধিকাংশ মাদ্রাসা ও এতিমখানায় আর অনেকে পুঁতে রাখাসহ নদী ও ডোবানালায় ফেলেছেন নিকলী-বাজিতপুরে বিএনপিতে বিভক্তি, সুবিধা নিচ্ছে আ’লীগ মুষলধারে বৃষ্টিতেও শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজীর ঢল ঐতিহ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনের প্রাণকেন্দ্র বাজিতপুর বাজার

হাওর শুকাতেই কৃষক ঝুঁকছে কৃষি ও খামারে

Reporter Name / ৪৬৯ Time View
Update : শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

নিজেস্ব প্রতিবেদকঃ নিকলীতে হাওরের পানি শুকাতেই কৃষির পাশাপাশি গবাদি পশু লালন-পালনে অধিক লাভের আশায় কৃষক ছুটছেন বাতান মুখী। হাওরের বুকে অনাবাদি জমির পাশাপাশি আবাদি জমিতেও লাভের আশায় ঘাসের আবাদ চলছে। অনেকে ঘাসও বিক্রি করে থাকে। কৃষকদের ভাষ্য, চালানের তুলনায় হাওরে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ভাগ লাভ হয়ে থাকে পশু পালনে। যে কারণেই দিন দিন বাড়ছে ঘাসের আবাদ।

ধানে বেশি লাভ নাকি পশু পালনে? এমন প্রশ্নের জবাবে অসংখ্য কৃষকের মুখে মিলে, ‘কৃষির পাশাপাশি ধান ও পশু পালনের যৌথ পদ্ধতিই তুলনামূলক লাভজনক’

 

কৃষি প্রধান এ দেশে কৃষির উপকরণের সাথে সম্পৃক্ত গবাদি পশু পালন। চলতি মৌসুমে কৃষকদের মাঝে দেখা দিয়েছে বিভিন্ন প্রকারের সবজি আবাদের পাশাপাশি অধিক আকারে পশু পালন। হাওরের বুকে অস্থায়ী খামার প্রস্তুতের কাজও চোখে পড়ার মতোই। সেখানে যারা অস্থায়ীভাবে বসবাস করে তারাই বাতানী নামে পরিচিত। বাতানে গরু লালন-পালনকেই অধিক লাভজনক বলে জানান খামারিরা। বাতানে পশু পালনে খরচও তুলনামূলক কম হয়ে থাকে। বাজার থেকে অতিরিক্ত পশু খাদ্য কিনতে হয় না। স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অফিসের দেয়া তথ্যমতে, নিকলী উপজেলায় গত বছর ৬৬ হাজার গরুর তথ্য মিলে। যার আনুমানিক মূল্য ৩ শ’ ৯৬ কোটি টাকা। পাশাপাশি ১৩ হজার ছাগল, ৪ হাজার ৩০০ভেড়া আর ১৮০টি মহিষও। চলতি মৌসুমে ৭৪ হাজার গরুর টার্গেটর তথ্য তুলে ধরেন স্থানীয় প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা। সেই অনুপাতেই মহিষ, ছাগল এবং ভেড়ার পরিমাণও বাড়বে বলে যুক্তি তোলেন। এসবের ৬০ ভাগই হাওরে বাতানের। বাতানে আরও একটি লাভজনক বিষয় মাংসের পাশাপাশি দুগ্ধজাত গাভী পালনে। নিকলীতে গত বছরও ২৫ হাজার মেট্রিকটন দুধ উৎপাদন হয়। যার মূল্য প্রায় ১ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা। বাতানের সুস্বাদু দুধ স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত করণের মাধ্যমে নৌ পথে ও সড়ক পথে ঢাকা ও তার আশেপাশে বাজারজাত হয়। হাওরে দুধের দাম তুলনামূলক ৩০ থেকে ৫০ ভাগ পর্যন্ত কম থাকে। তাই সকালের দিকে বাতান মুখী অসংখ্য পাইকারদের দেখা মিলে। এখানকার এসব দুধের একটি অংশ অষ্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পনির, বাজিতপুর সন্দেশ, নিকলীর দুধের নাড়ুসহ হরেক প্রকারের মিষ্টান্ন তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এছাড়াও স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রির উদ্দেশ্যে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। সেখানকার গবাদি পশুর বিষ্ঠা পর্যন্ত অধিকাংশ খামারিদের আর্থিক যোগানে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

 

কিশোরগঞ্জ জেলাটি অধিকাংশই হাওর নিয়ে গঠিত। যে কারণে হাওরাঞ্চল হিসেবেই স্বীকৃতি প্রাপ্ত। যার আয়তন প্রায় ২,৬৮৯ বর্গকিলোমিটার। আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১৭ হাজার ৮২০ হেক্টর। মোট জনসংখ্যা দেড় লাখের কাছাকাছি হলেও অধিকাংশরাই দারিদ্র্য সীমার নিচের স্তরের। তাদের ভাগ্য বদলের অন্যতম রাস্তা কৃষি ও পশু পালন।

 

নিকলীতে হাওরের অন্যতম উপার্জনের মাধ্যম বোরো উৎপাদন। কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ১৪ হাজার ৪৩১ হেক্টর জমিতে ৬৩ হাজার মেট্রিকটন চাউল উৎপাদন হবে। যার আনুমানিক মূল্য ৩ শ’ ৭৮ কোটি টাকা। এছাড়া ধানের খরখোটা পর্যন্ত অর্থনৈতিকভাবে যোগান দেয়।

 

হাওরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার নিকলী একটি হাওর বেষ্টিত পর্যটন এলাকা। ঐতিহাসিক এবং ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন জনপদের নাম নিকলী। নিকলীর মোট আয়তন প্রায় ২১৪.৩৯ বর্গকিলোমিটার। এখানকার অধিকাংশই নদী-নালা, খাল-বিল ও হাওরের আবাদি-অনাবাদি জমিতে ঘেরা। বর্ষায় প্রায় ৬ মাস পানিতে তলিয়ে থাকে সেখানকার অসংখ্য রাস্তাঘাট। পানি শুকাতেই শুরু হয় কৃষক ও খামারিদের দিবানিশি হাওরে অবস্থান। শীতের কুয়াশা উপেক্ষা করে কৃষি কাজের পাশাপাশি ক্ষুদ্র খামারিরাও গবাদি পশু পালনের লক্ষ্যে অনাবাদির পাশাপাশি আবাদি জমিতেও আজকাল অনেকাংশে ঘাসের আবাদ করে থাকে। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে আলো বাতাসে ভরপুর, অতি উর্বর জমিতে তেমন ঘাসের পরিচর্চা করতে হয় না বলে জানা গেছে। অল্পস্বল্প পরিমাণে ইউরিয়া সার প্রয়োগের ফলেই বেড়ে উঠে সেখানকার এসব গবাদি পশুর খাবারের উপযোগী এসব ঘাস। রোপণেরও তেমন একটা প্রয়োজন পড়ে না। স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস আর হাওরের ঘাস খেয়ে গরু মহিষ, ছাগল, ভেড়া অতি দ্রুত বেড়ে উঠে, রোগমুক্ত থাকে। এমনকি অধিক পরিমাণে মাংসে পরিণত হয়ে উঠে। গবাদি পশু মোটা তাজাকরণের পাশাপাশি অনেকে আবার দুধের লক্ষ্যে দুগ্ধজাত গাভীও লালন করে থাকে। এখানে শুধু স্থানীয়দের বাতান নয় বরং জেলার বাহিরের দূরদূরান্ত থেকে এসেও ধানের পাশাপাশি উচু জমিতে টুকিটাকি ভুট্টার আবাদ হয়। সেখানে ধানি জমির আইলে মিষ্টি কুমড়ারও আবাদ হয়ে থাকে। অনেকের নিজের জমি না থাকলেও ধানের পাশাপাশি ঘাস আবাদের লক্ষ্যে অন্যের জমি চুক্তিতে রেখে আবাদ করে।

 

সরেজমিনে গত ২৭ নভেম্বর জেলার সর্ববৃহৎ ঐতিহ্যবাহী নিকলী সাজনপুর-আঠার বাড়িয়া গরুর হাটে খোঁজ নিলেই ধরা পড়ে খামারিদের গরু কেনার দৃশ্য। ক্ষেতাদের অধিকাংশকেই হাটে কিনতে দেখা গেছে তুলনামূলক বাড়ন্ত বয়সের আর শুকনো আকারের গরু। হাওর দ্বীপের ছাতিরচর এলাকার শহীদ মিয়া বলেন, হাওরের পানি শুকিয়ে গেছে তাই গরু মোটা তাজাকরণের লক্ষ্যে বাজারে গরু কেনার ধুম পড়েছে। তারাও কিনে নিচ্ছেন। এমনকি জোয়ান শাহী বাতানের উদ্দেশ্যে সেখানে একেকজন দশ থেকে শতাধিক গরুও কিনে থাকেন বলে উল্লেখ করে। এছাড়াও বোরোলিয়া হাওরের পরিচিত কৃষক কামরুল হাসান জানান, বীজ তলার কাজ শুরু হয়েছে। তার মোট ৩৫ শ’ শতাংশ আবাদি জমিতে নিয়মিত বোরো ধান করেন। ধানের পাশাপাশি বাতানে গবাদি পশু পালন করেন। এ বছরও কমপক্ষে ২০টি গরু লালন পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে উল্লেখ করেন। সঠিকভাবে যারা পশুর পরিচর্যা করে কৃষির পাশাপাশি সকলেই লাভবান বলে ইঙ্গিত করেন।

 

নিকলীর ৭টি ইউনিয়নের ৪৩টি মৌজায় ১২৮টি গ্রামের আশেপাশে অসংখ্য ছোট-বড় হাওর রয়েছে। এ সবে মধ্যে উল্লেখযোগ্য জোয়ানশাহী ও বড় হাওর। জোয়ান শাহীর অধীনে প্রায় ৩৮ শ’ হেক্টর জমি রয়েছে। এতে বোরো আবাদ হয় ৩ হাজার হেক্টর। এ হাওরটি নিকলী, বাজিতপুর ও অষ্টগ্রাম ও কুলিয়ার চরের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত। এছাড়াও কটিয়াদী, নিকলী ও করীমগঞ্জ এই ৩টি উপজেলা নিয়ে গঠিত দ্বিতীয় বৃহত্তর বড় হাওর। এসব হাওরে লক্ষ্য করা যায় ধানের পাশে গবাদি পশু পালনের লক্ষ্যে ঘাস আবাদের। অনেক হাওরে সাম্প্রতিক বীজ তলার কাজ শুরু হয়েছে আর অনেক হাওরে ঘাস বেড়ে উঠার লক্ষ্যে তত্ত্বাবধানে রাখছে।

 

হাওর দ্বীপ খ্যাত ছাতিরচরের চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, দায়িত্বে থাকারা কৃষকদের প্রণোদনায় নয়ছয় বন্ধ করে, সহজ শর্তে মৌসুমী ঋণে সহায়তা করলে আর হাওরের রাস্তা সংস্কারের দিকে নজর দিলেই কৃষি ও খামারে অধিক লাভবান সম্ভব।

 

নিকলী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মো. আবু হানিফ বলেন, গত বছর পুরো উপজেলাতে ৬৬ হাজার গবাদি পশু লালন পালন করা হয়েছিলো। এর মধ্যে ৬০ ভাগই হাওরের বাতানে লালন পালন করা হয়েছে। ক্ষুদ্র খামারীরা সাধ্য অনুযায়ী দশ থেকে ২০ এমনকি শতাধিক পর্যন্ত পালন-পালন করে থাকে। এসবের মধ্যে মাংসজাত এবং দূগ্ধজাত উভয়ই হয়ে থাকে। তবে অধিকাংশই মাংসের বলেও উল্লেখ করেন। এছাড়াও এ সব পশুদের অধিকাংশই জোয়ান শাহী হাওরের বাতানে থাকে বলে নিশ্চিত করেন। বাতানে এসব পশু বর্ষার পানি উঠার ঠিক আগ মুহুর্ত পর্যন্তই থাকে। অন্যান্য বছরের ন্যায় তিনি আশা করছেন তুলনায় কম হবে না।

 

নিকলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুস সালাম বলেন, কৃষকদের প্রণোদনা দেয়া হয়ে থাকে পরোক্ষভাবে। চলতি বছরেও ২৮ হাজার কোটি টাকা সারের ক্ষেত্রে প্রণোদনার বিষয়ে উল্লেখ করেন। এমনকি নিকলীও সেই সুবিধার অন্তর্ভুক্ত বলে জানান। এছাড়াও সেচ প্রকল্পসহ বিভিন্ন কোম্পানির বীজে কৃষক সুবিধা নিচ্ছেন। তবে সেক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি অনিয়মে জড়িত থাকলে আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি নিজে কোনো অনিয়মের সাথে জড়িত নন বলে দাবি করেন।

 

জেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. মো.সাদিকুর রহমান বলেন, গত মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন এবং ন্যায্য মূল্য পেয়ে কৃষকরা চলতি মৌসুমে অধীর আগ্রহে নেমেছে। ইতিমধ্যে ৩০ ভাগ বীজতলার কাজও সম্পন্ন হয়ে গেছে। গত বছর জেলায় বোরো আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ২১০ হেক্টর জমিতে। গত বছরের তুলনায় আবাদ বাড়ার সম্ভাবনা থাকার কথাও জানান।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd