বিশেষ প্রতিবেদনঃ কিশোরগঞ্জ ও তার আশপাশের হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা উপজেলাতে জীব বৈচিত্র্যের ব্যাপক তারতম্য দেখা দিয়েছে বলে অসংখ্য গবেষকরা তাদের যুক্তি তুলে ধরেছেন। এমনকি আবহাওয়ার কুপ্রভাবের ফলে অকল্যাণেরও আশঙ্কা প্রকাশ করে চলেছেন নানান যুক্তি তুলে ধরে। সেই সাথে স্থানীয়রাদের অসুবিধার চিত্রও উঠে আসে সরেজমিনে।
কিশোরগঞ্জ হাওরের নিকলী-বাজিতপুর, অষ্টগ্রাম, ইটনা, মিঠামইনসহ পাশ্ববর্তী জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ পাশ্ববর্তী জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ হাওরে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে সাম্প্রতিক মৌসুমগুলোতে। চলতি বছর তুলনামূলক এর প্রভাব অনেকাংশে বেশি। এই পরিবর্তনের জন্যে অন্যতম দায়ী আবহাওয়া ও জলবায়ুজনীত প্রাকৃতিক কারণ। অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি আর নদীর গতিপথ পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য বিশেষ কিছু কারণও এর সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে বলে উঠে আসে। স্থানীয়দের মতে, মাঝে মাঝে হাওরে অকাল বন্যা দেখা দিলেও এখন আর হাওরে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানির দেখা মিলছে না। কমেছে বন্যার শঙ্কাও। তবে ভাগ্য পুড়ছে মৎস্য আহরণকারীদের। অপর দিকে ইতিবাচক দিক বিবেচনায় উল্লেখ করা হয়েছে ভারতের মেঘালয় প্রদেশের সীমান্তবর্তী নদীগুলোর খনন কাজের ফলে নদীর গতি পথ পরিবর্তিত করে এসবের পানি ভিন্ন দিকে প্রবাহিতের ফলে বৃহৎ নদী হয়ে সমুদ্র পথে গিয়ে মিশেছে। এর ফলে পাহাড়ী ঢল ও অতিবৃষ্টির পানি এখন আর এই সকল হাওরাঞ্চলের উল্লেখযোগ্য স্থানে তেমন একটা জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করতে পারেনি। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তের সম্ভাবনা কমে এলেও বিপরীতে মাছের বংশবৃদ্ধির পথে মারাত্মকভাবে বাধারও সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও অপর্যাপ্ত পানি আর অপরিকল্পিত বাধ এবং রাস্তা নির্মাণের ফলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মাছের বংশ বিস্তারের ক্ষেত্রে। হাওরে মাছের বিচরণের পরিধি ক্ষেত্র কমে আসায় বংশ বিস্তারে যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তেমনিভাবে অতি সহজে ধরা পড়ছে অসময়ে বিভিন্ন সাইজের মাছ। তাছাড়াও হাওরের ফসলি জমিতে অধিক পরিমাণে ফসলের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরণের কীটনাশক প্রয়োগ হচ্ছে। পানির প্রবাহ না থাকায় বর্তমানে স্থানান্তরিত হচ্ছে না। এর ফলে দরুন মাছের প্রজনন ক্ষেত্রে কুপ্রভাব ফেলে। তাছাড়াও জমিতে পলিমাটির পরিমাণ কমে গেছে।
অনুসন্ধানে দখা গেছে, আবহাওয়াজনিত তারমধ্যের ফলে শুধু আকাশে নয় পাতালেও পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। ভূগর্ভস্থে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। বৃষ্টিতেও এসিডের পরিমাণ বেড়ে গেছে। যা মাছের জন্যে ক্ষতিকর। সাধারণত এসিড বৃষ্টি হয় মানুষের নেতিবাচক কার্যকলাপের ফলে উৎপন্ন সালফার ডাই অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড গ্যাস বায়ুমণ্ডলে মিশে যাওয়ার কারণে। এই গ্যাসগুলো বৃষ্টির পানির সাথে মিশে সালফিউরিক অ্যাসিড এবং নাইট্রিক অ্যাসিড তৈরি করে, যা বৃষ্টির পানিকে স্বাভাবিকের চেয়ে অধিক পরিমাণে অম্লীয় করে তোলে। ফলে এসিড বৃষ্টির সৃষ্টি করে।
কিশোরগঞ্জের নিকলী, বাজিতপুর অষ্টগ্রাম ও মিঠামইনের দায়িত্বে থাকা প্রথম শ্রেণীর আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র অবজারভারের দেয়া তথ্যমতে, হাওরের এসব এলাকার জলবায়ুর পরিবর্তনের মাত্রা লক্ষ্যণীয় বলে উল্লেখ করেন। বাতাসেও জলীয় বাষ্পের তারতম্য, অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টি, তুষারপাত আর অতিরিক্ত ঠান্ডা ও গরমসহ প্রাকৃতিক নানাবিধ পরিবর্তের বিষয়ে উল্লেখের পাশাপাশি বাস্তবতা স্বীকার করেন। বাতাসে সিসার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, কার্বনডাই অক্সাইড বেড়ে যাওয়া আর সকল কুপ্রভাবের জন্যে মানুষের সৃষ্টি বায়ু দূষণকেই দায়ি করেন তিনি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মমিন ভূঁইয়ার দেয়া তথ্যমতে, হাওরাঞ্চলে সিসা জাতীয় কারখানা না থাকলেও আশেপাশের শহরমুখী এসব কারখানা পরিবেশে কুপ্রভাব ফেলে। এছাড়াও কালো ধোঁয়া নির্গত হয় এসব কলকারখানা পরিবেশ দূষণের জন্যে অনেকাংশে দায়ী। পরিবেশ দূষণের সাথে সম্পৃক্ত থাকা আবহাওয়া, তাপমাত্রা ও জলবায়ুর তারতম্যের বিষয়ের বাস্তবতা তিনি স্বীকার করেন। এছাড়াও বৃক্ষ লতার পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে পরিবেশের তারতম্য ঘটে থাকে বলে উল্লেখ করেন।
কিশোরগঞ্জের পাউবোর কর্তব্যরত নিবার্হী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাজাত হোসেনের সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে এই সেক্টরের অধীনস্থদের সাথে কথা হলে হাওরাঞ্চলে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি না আসার কারণ স্বরূপে সর্বশেষ নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সফলতার কথাও তারা উল্লেখ করেন।
কিশোরগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম জানান, একের সেক্টর দেখেন একেক দৃষ্টি ভঙ্গিতে দেখে থাকেন, তবে তার মতে, প্রাকৃতিক তারতম্যের কারণে অনাবৃষ্টি আর দেরিতে হাওরে পানি আসে বলে স্বীকার করেন। এছাড়াও নদীপথে পলি/মাটির স্থর পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় কারণে পাহাড়ি এলাকার ঢলের পানি নিচু ভূমিতে দ্রুত নেমে আসার পথে বাধাগ্রস্ত হয় বলে উল্লেখ করেন। বিকল্প পথে পানি চলে যায় বলে ইঙ্গিত করেন। এছাড়াও অপরিকল্পিত বাধ নির্মাণ মাছের বিস্তারের অন্তরায় বলে জানান। এছাড়াও নানাবিধ কারণকে তিনি মাছের বংশবিস্তারের পথে বাধা বলে উল্লেখ করেন।