নিজেস্ব প্রতিবেদকঃ নিকলীতে ইটভাটা শুরুর পর থেকেই মালিকরা সেখানকার সকল প্রকার অনিয়মকে যেনো নিয়মে পরিণত করে নিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই নিয়মবহির্ভূতভাবে চলে সেখানকার সব কয়টি ইটভাটা। এমন আফসোস ও ক্ষোভের ভাষ্য, স্থানীয়দের মাঝে।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার পশ্চিম কুর্শা গ্রামের আলাদীনের চেরাগ হাতে পাওয়ার ন্যায় রাতারাতি শিল্পপতি বনে যাওয়া পরিবারের লোকেরা যুগে যুগে রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করে যাচ্ছে কৌশলিক কায়দায়! যখন যেই সরকার ক্ষমতায় আসে তখনি সেই পরিবারের লোকেরা অবৈধ রাজনৈতি সুবিধা নিয়েছে সেই দলের হয়ে। এই পরিবারের লোকদের ঘিরে অর্থের দৌরাত্ম্যে রাজনৈতিক পদপদবি ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে সীমাহীন। খোঁজ নিলেই বেড়িয়ে আসবে এ পরিবারের অবৈধ অর্থের উৎস ও এসবের প্রকৃত সন্ধান । কেটে খাওয়া থেকে শিল্পপতি বনে যাওয়াদের গোপন রহস্যও। মিলবে ইউরোপের দেশ অষ্ট্রিয়া থেকে অবৈধ উপায়ে সরকার ফাঁকি দিয়ে আদানের বিষয়ও। এমন তথ্য ও অভিযোগ স্থানীয়দের। এই পরিবারের লোকদের ঘিরে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও দীর্ঘদিন থেকে। স্বার্থের জন্যে ওরা সব ধরণের কৌশল কাটাতে পারে। স্থানীয়দের দেয়া তথ্যমতে জানা গেছে দুই যুগের কাছাকাছি সময়ের ব্যবধানে এআ পরিবারের কেটে খাওয়া লোকেরা আজ অগাধ টাকার মালিক। এ সবের উৎস নিয়েও রয়েছে নানান গুঞ্জন ও সমালোচনা। ইন্জিনিয়ার আবুল হাসিম প্রায় দুই যুগ আগে ইউরোপের দেশ অস্ট্রিয়াতে যান পড়াশোনার ভিসায়। এছাড়াও বেশ কয়েকজন ভাইপোকে সেখানে নিয়ে কাজে লাগান। সুযোগে ক্যাসিনো ভাইপো নজরুল ইসলাম ইউরোপের কথা বলে চাচার পরিচয়ে শতশত লোককে সর্বশান্ত করে। মুলত উত্থান শুরু হয় হাসিমের মাধ্যমেই। সর্বশেষে যৌথ পরিচালনায় ইটভাটা থেকে শুরু করে একাধিক ব্যবসা পরিচালনা করলেও অর্থনীতিক দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছে ইটভাটা ও তার মালিকানাসহ অর্থ সংক্রান্ত জটিলতা থেকেই। এই পরিবারের অবৈধ ইটভাটায় বিপন্ন আশেপাশের পরিবেশ। এলাকাবাসী ভোগান্তির শিকার হলেও তাদের কৌশলিক কায়দার কাছে প্রতিকার না পেয়ে হতাশায় স্থানীয়রা।
চোখ মেললেই ধরা পড়ে নিকলী সদরের কুর্শা গ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলিয়া মাদ্রাসা, কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানা এবং একাধিক হাট ও বাজার সংলগ্ন দু’টো ইটভাটাতেই বৎসরের পর বৎসর পোড়ানো হচ্ছে ইট। ভাটা দুইটির নাম নাম মেসার্স কামাল ব্রিকস ও আলতাফ ব্রিকস। এছাড়াও গাঁ ঘেঁষে একই মালিকানাধীন যৌথ পরিচালনায় মেসার্স সামিহা ব্রিক ও শাপলা ব্রিক ফিল্ড। সামিহা ব্রিক ফিল্ডটি অবস্থিত জারইতলা ইউনিয়নের বনমালীপুর এলাকার গাঁয়ের পাশে মূল রাস্তা ঘেঁষে। যেটি তিন ফসলি জমির উপর নির্মিত। এছাড়াও অপরটি নিকলী উপজেলার পার্শ্ববর্তী কটিয়াদী উপজেলার করগাঁও ইউনিয়নের কান্দালিয়ায়। এটিও দুই ফসলি জমির উপর এবং গাঁ ও রাস্তা ঘেঁষে নির্মিত।
সরকারি তালিকায় এসব ভাটার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। পরিবেশ ছাড়পত্র, জেলা প্রশাসক কর্তৃক লাইসেন্স ও অগ্নি সংযোগের অনুমোদন কোনটাই সাম্প্রতিক দেয়া হচ্ছে না তবুও স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই আদালতে রিটের দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর চালিয়ে যাচ্ছে ঝিকঝাক নামের এসব অবৈধ ইটভাটা।
ইটভাটা স্থাপন নীতিমালা অনুসারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনবসতি, কৃষিজমি, বন, নদী ও রাস্তার সংলগ্ন এলাকায় ইটভাটা আইনিভাবে নিষিদ্ধ। তাছাড়া মাদ্রাসও স্কুল ঘেঁষে, হাটবাজার ও পর্যটন এলাকার জনবহুল রাস্তা ঘেঁষে এ সব ইটভাটা।
বিদ্যালয়ের পাশে গাঁ ঘেষে এসব ইট ভাটায় স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে পরিবেশ। দিবানিশি নির্গত হচ্ছে কালো ধোঁয়া। আইন অমান্য করেই দিনের পর দিন এই সব ইটভাটা চললেও প্রশাসনের নীরব ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয়রা। দফায় দফায় এসব ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হলেও কোনো ধরণের প্রতিকার না পেয়ে হতাশায় ভোক্তভোগীরা। রোদার পুড্ডা বাজারের ব্যবসায়ী মো. সেলিমসহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অসংখ্য এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, এই ইটভাটা মালিকরা এতটাই প্রভাবশালী যে কারণে তাদের বিরুদ্ধে কিছুই করার ক্ষমতা নেই স্থানীয়দের। এছাড়া প্রশাসনের ভূমিকাও রহস্যময়। একদিকে ভাঙ্গে অপরদিকে গড়ে! ক্ষোভের ভাষায় স্থানীয়দের বলতে শোনা যাচ্ছে তাদের ইটভাটার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে যারা প্রতিবাদ করেছেন তাদের অধিকাংশই উল্টো কৌশলিক কায়দায় তাদের পরিবারের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই পরিবারের লোকেরা জামাত, আওয়ামীলীগ ও বিএনপির রাজনীতির সাথে মিলে অবৈধ সুবিধা নিয়ে থাকে বরাবরের মতো এখনো।
এই পরিবারকে ক্ষমতাশালী উল্লেখ করে স্থানীয়রা আরও বলেন, এই পরিবারের যৌথ মালিকানায়
মেসার্স কামাল ব্রিক ফিল্ড ও সামিহা ব্রিক ফিল্ডের মালিকের মধ্যে ইমরুল হাসান হলেন নিকলী থানা ছাত্রলীগের সভাপতি। মেসার্স আলতাফ ব্রিক ফিল্ডের যৌথ মালিকানাদে মধ্যে থানা আওয়ামীলীগের পদেষ্টা হাজী মোঃ রূপালী মিয়া ও জামায়েতের নেপথ্যে থাকা ডোনার বলে পরিচিত অস্ট্রিয়া বসবাসকারী ইঞ্জিনিয়ার মোঃ আবুল হাসেম। এছাড়াও শাপলা ব্রিক ফিল্ডের মালিক ইদ্রিস আলী ওরফে ইদু মিয়া যিনি সমালোচিত থানা বিএনপি নেতা।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে ইটভাটা মালিকরা শুরু থেকেই সুবিধা নিয়েছে রাজনৈতিকভাবে। যখন যে দল ক্ষমতায় ছিলো সেই দলেরই অবৈধ সুযোগ নিয়ে অবৈধ ইটভাটা পরিচালনা করেছে দিব্যি। বর্তমানে কেয়ারটেকার সরকার ক্ষমতায় থাকলেও ওরা জামাতের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি বিএনপি দিয়েও সুবিধা নেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে বলে সীমাহীন গুঞ্জন স্থানীয়দের মাঝে। এছাড়াও অবৈধ টাকার ছড়াছড়ির কারণে স্থানীয় প্রশাসনও এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেনো দেখেও দেখে না। পর্যটন রাস্তা ও নদীকুল ঘেঁষে দৃশ্যমান এ সব কিছু যেনো চোখ পড়ে না!
সংলগ্ন ইবনে তাহমিনা মাদ্রাসার কয়েকজন শিশু শিক্ষার্থী এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, মাদ্রাসার ঠিক পাশেই ইটভাট! এর কালো ধোঁয়া আর ধুলা ক্লাসের ভেতরে ঢুকে যায়। শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। পড়ায় মন বসে না। রাতে ঘুমেও ডিস্টার্ব হয়। এছাড়াও ইবনে তাহমিনার ইয়াসিনসহ একাধিক শিক্ষক জানান, ইটভাটা গুলো বন্ধ হলে তারা সুন্দর পরিবেশে লেখাপড়া করতে পারবে। শ্বাসকষ্টজনীত রোগবালাইসহ শব্দদূষণ থেকেও মুক্তি পাবে।
জারইতলা কমিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্য কর্মী আব্দুস সোবহান বলেন, এখানকার অবৈধ এসব ইটভাটা যেমন শিশুদেরকে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে, ঠিক তেমনি জমির টপ সয়েলও গিলে খাচ্ছে আর জমি হারাচ্ছে উর্বরতা শক্তি। এছাড়াও নারিকেল ও সুপারিসহ ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় পরিবেশের বারোটা বাজাচ্ছে। বনমালীপুরের পাশাপাশি মেটোরাস্তাকে চলাচলের অযোগ্য করে ফেলেছে। তাই উন্নয়ন মূলক কাজ ঠিকিয়ে রাখতে হলে বৈদ্যুতিক ইটভাটা নির্মাণ কিংবা ব্লকের ব্যবহার অতি জরুরী হয়ে উঠেছে।
নিকলী উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা রেহেনা মজুমদার মুক্তির সাথে নিকলীর সবকটি ইটভাটার বৈধতার বিষয়ে কথা হলে তিনি জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলার পরামর্শ প্রদান করেন।
কিশোরগঞ্জ জেলার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মমিন ভূঁইয়া মুঠোফোনে জানান, নিকলীর সবকটি ইটভাটা অবৈধ। এছাড়াও কিছুদিন আগে মেসার্স আলতাফ ব্রিক ফিল্ডকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছে। পুনরায় কিভাবে তারা স্থাপন করে নিয়েছে কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে এমন প্রশ্নে বিষয়টি তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান। পাশাপাশি সামিহা ব্রিকসহ বাকীদের বিষয়েও রিট পরবর্তী অভিযান চলবে বলে ইঙ্গিত করেন।
জেলা প্রশাসক ফৌজিয়া খানের সাথে নিকলীর ইটভাটার বৈধতার প্রশ্নে কথা হলে তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত রয়েছেন জানিয়ে তথ্যের দায়িত্বে থাকাদের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ প্রদান করেন।