হাওরাঞ্চলে কোরবানির চামড়ার নাই কদর
আলি জামশেদ কিশোরগঞ্জেঃ হাওর অদ্ভুষিত কিশোরগঞ্জের নিকলী-বাজিতপুরসহ হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে কোরবানি পশুর চামড়া শিল্পে ধসের দৃশ্য মিলেছে। ক্রেতার খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফ্রিতে সংগ্রহ কারীর অভাবেও অনেক স্থানে মাটি চাপা এমনকি বিক্রির উদ্দেশ্যে জমা করে রাখা চামড়া রাতে ডোবা-নালা ও নদীতে ফেলতে হয়েছে। পরিবেশ দূষণের কারণ হয়েও দাঁড়িয়েছে অনেক স্থানে। কদর কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে অনেকেই মন্তব্য করতে নারাজ। তবে কেউ কেউ এ শিল্প সিন্ডিকেটের কবলে জিম্মি বলেও উল্লেখ করেন। এই শিল্পের সাথে জড়িত রয়েছে বহু লোক। এমনটি উল্লেখ করে এ শিল্প বাঁচিয়ে রাখার লক্ষ্যে সরকারি তদারকিরও দাবি জানান।
সরেজমিনে নিকলী-বাজিতপুর অষ্ট্রগ্রাম ও আশেপাশের এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এতিমখানা ও মাদ্রাসায় ফ্রীজে নিজ খরচে দিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে হাওর দ্বীপ ছাতিরচর ও অষ্ট্রগ্রামের ন্যায় দুর্গম এলাকায় খরচের হিসাব করে ফ্রিতে ও নিতে রাজী না হওয়ায় নদীনালায় ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন স্থানীয়রা।
নিকলী উপজেলার রবি সম্প্রদায়ের অসহায় বয়োবৃদ্ধা শান্তি রবিদাস এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এখন আর পশুর চামড়া কিনে নিয়ে রোদে শুকিয়ে লবন ও গাড়ি ভাড়ার খরচ হিসেব করে কোনোমতেইপোষায়নি। এক সময় কোরবানির পশুর চামড়ার অপেক্ষায় থাকতেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিনে নিয়ে আসতেন একটুখানি লাভের আশায়। এখন সেই দিন আর নেই বলে আফসোসে ফেটে পড়েন। এই বছর ফ্রিতে দিলেও তিনি নিতে রাজী হচ্ছেন না। উল্টো লসের কথাই তুলে ধরছেন।
নিকলী উপজেলার আঠার বাড়ীয়া গ্রামের রুছমত আলী জানান, আড়াই লক্ষাধিক টাকার বিনিময়ে একটি ষাঁড় মহিষ কোরবানি দিয়েছিলেন। চামড়া নেওয়ার লোক খুঁজে পাননি। সন্ধ্যর দিকে মুচি সম্প্রদায়ের লোক ডেকে এনে দিতে হয়েছে দুর্গন্ধ দূর করার লক্ষ্যে। মুচি সম্প্রদায়ের বিগন রবিদাস জানান, এই বছর এসব চামড়ার কদর নাই তাই গাড়ি ভাড়া দিয়ে নেওয়ার পর পোষায়নি।
বাজিতপুর উপজেলার দিলালপুর ইউনিয়নের শশের দিঘী এলাকার বয়োবৃদ্ধ হারুন অর রশিদ জানান, চামড়ার কদর এতটা কমে যাবে তা অবিশ্বাস্য। চলতি বছর চামড়ার কদর না থাকায় কিনে নেওয়ার লোকও মিলেনি তেমন একটা। এই বিষয়ে সরকারের নজর দেওয়ার প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। এই শিল্পের সাথে অনেক লোক জড়িত রয়েছে তাই এর দিকে নজর দেয়া উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
হাওর দ্বীপ ছাতিরচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান চৌধুরী ওরফে ইয়ার খান জানান, তার ১ লক্ষ ৯৫ হাজার টাকার ষাঁড় গরুর চামড়া ২০০ টাকায় দিতে হয়েছে । তবে তিনি আরও উল্লেখ করেন অনেকে বিক্রি করতে না পারায় সন্ধ্যার দিকে ঘোড়াউত্রা নদীতে ফেলে দিয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
অষ্ট্রগ্রাম উপজেলা সদরের ৫নং ওয়ার্ডের স্কুল শিক্ষক সরফুদ্দিন আহমেদ লিচু জানান, তাঁর এলাকায় এই বছর কোরবানির পশুর চামড়া কিনার লোক খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়ে নিজ খরচে মাদ্রাসায় গিয়ে দিয়ে এসেছেন বলে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের চামড়া শিল্প এখনও দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হলেও নানা জটিলতার কারণে প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। তৈরি পোশাক শিল্পের পর এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত হিসেবে বিবেচিত হলেও পরিবেশগত মান, আন্তর্জাতিক সনদ ও ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণে খাতটি দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে আছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও চামড়ার জুতা রপ্তানি থেকে প্রায় ৯৮৮ মিলিয়ন ডলার আয় হয়। অনুসন্ধানে উঠে আসে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫.৯৫ শতাংশ বেশি। চামড়ার পাদুকা ও পোশাক খাত বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৮.৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নানা দিক থেকে ভূমিকা রাখছে রপ্তানি খাতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের কাঁচা চামড়ার প্রাপ্যতা ও পশুসম্পদের ভিত্তি শক্তিশালী হওয়ায় সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই খাত থেকে বছরে ১০-১২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রপ্তানি আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে গবেষকরা উল্লেখ করেন। এছাড়াও গবেষকদের ধারণা সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীতে পরিবেশগত মান ও বর্জ্য শোধন ব্যবস্থার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্য সনদপ্রাপ্ত ট্যানারির সংখ্যা খুবই কম। কোরবানির মৌসুমে সংগৃহীত অনেক চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ না হওয়ায় গুণগত মান নষ্ট হয়। যে কারণে রপ্তানি বাজারে অতিরিক্ত কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। দেশে দক্ষ শ্রমিক, আধুনিক প্রযুক্তি ও উচ্চমূল্যের চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমাণে ঘাটতি রয়েছে। সেক্ষেত্রে সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর পরিবেশগত অবকাঠামো দ্রুত আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা অতি জরুরী। অধিক সংখ্যক ট্যানারিকে আন্তর্জাতিক এল.ডব্লিউ.জি সনদ অর্জনে সহায়তা করা। কোরবানির চামড়া সংগ্রহ, লবণজাতকরণ ও সংরক্ষণে উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। কাঁচা চামড়া রপ্তানির পরিবর্তে ব্যাগ, জুতা, বেল্ট, জ্যাকেটসহ উচ্চমূল্যের চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান ও ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম জোরদার করা দরকার। খামারি, মৌসুমি চামড়া সংগ্রাহক ও ট্যানারি মালিকদের জন্য সহজ ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার কাঁচামাল পেলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা, পরিবেশগত সংকট ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় দেশের চামড়া শিল্প এখনো তার প্রকৃত সম্ভাবনার অনেক নিচে অবস্থান করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে চামড়া শিল্প বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতে পরিণত হতে পারে।
অষ্ট্রগ্রাম উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা সিলভিয়া স্নিগ্ধার সাথে মুঠোফোনে চামড়ার কদর প্রসঙ্গে কথা হলে সেখানেও তেমন একটা চড়া দামে বিক্রি হয়নি বলে জানান। এছাড়াও অধিকাংশরা স্থানীয় মাদ্রাসায় এবং এতিমখানাতে দিয়ে এসেছেন এমন বাস্তবতার কথাও স্বীকার করেন। কেনো চামড়ার কদর কমে গেছে? এমন প্রশ্নের জবাবে সার্ভে করে বলতে হবে বলে উল্লেখ করেন। তবে তিনি এখানে এক বছর হয়েছে যোগদান করেছেন এই বিষয়ে সার্ভে ছাড়া মন্তব্য করা কঠিন বলেই তিনি ইঙ্গিত করেন।
এই বিষয়ে নিকলী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রেহেনা মজুমদার মুক্তি, বাজিতপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জালাল উদ্দিনসহ কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের সাথে ০১ জুন বিকাল ৬টার পরবর্তীতে একাধিকবার মুঠোফোনে কথা বলার লক্ষ্যে চেষ্টা করা হলেও কাউকেই পাওয়া যায়নি।