কিশোরগঞ্জ হাওরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত গুরুত্বপূর্ণ দুই উপজেলা বাজিতপুর-নিকলীতে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলনের রমরমা ব্যবসা। বর্ষা মৌসুমে নদী থেকে রাতের আঁধারে বালু তুলছে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ‘বালুখেকো’রা। প্রশাসনের নাকের ডগায় চলছে এসব কর্মকাণ্ড, কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। হাওরাঞ্চলের ওই এলাকা দুটিতে বালুখেকোদের থাবা দিনকেদিন প্রকট হচ্ছে। এছাড়া বাজিতপুরের দিলালপুর, সাহাপুর, হিলোচিয়া, বাজিতপুর বাজারের দক্ষিণ পাশসহ একাধিক এলাকা বালু উত্তোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। শুধু বাজিতপুরেই নয়, নিকলীর কারপাশা, দামপাড়া, মজলিশপুর, সিংপুর, গুরই, জারইতলা এলাকার ফসলি জমি ও নদী তীরও রেহাই পাচ্ছে না বালুখেকোদের হাত থেকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই চলছে এই বালু ব্যবসা। স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই দীর্ঘদিন ধরে চলছে অবৈধ উত্তোলন ও বিক্রি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাজিতপুরের এক বালু ব্যবসায়ী বলেন, ইউএনওকে ম্যানেজ করেই এ সব করতে হয়। প্রশাসনের চোখের সামনে দিয়েই পাইপ বসিয়ে দিলালপুর বাজার থেকে ইব্রাহিম নগর পর্যন্ত চলছে বালু উত্তোলন ও পুকুর ডোবা ভরাট। সিন্ডিকেটের কব্জায় যেনো আটকে আছে স্থানীয় প্রশাসন। ফলে সিন্ডিকেটের কাঁধে সওয়ার হয়েই নিয়মিত মাসোহারা নিয়ে নীরব দর্শকের ভুমিকা পালন করে চলেছে প্রশাসন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, যারা প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করতে পারেন, তারাই শুধু ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের সুযোগ পায়। আর যারা পারেন না, তারা পড়েন জরিমানার মুখে। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে এক ধরনের বালি দানবের সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের সামনেই বালু মজুত করে বিক্রি হচ্ছে, অথচ কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। একাধিক বালু ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যারা এসব অনিয়ম তুলে ধরেন, তারাও অদৃশ্য চাপে প্রশাসনের কাছে গিয়ে চুপসে যান। অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে দুই উপজেলার নেতা-কর্মীদের মধ্যে অনেকটা বলবৎ রয়েছে গ্রুপিং। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মাঝেও চাঙ্গা এর প্রভাব। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিকলী উপজেলা সদরসহ একাধিক জায়গায় মারামারি ও সংঘর্ষের ঘটনার নজিরও রয়েছে।
সচেতন মহলের একজন জানান, বালি তোলে রাঘব বোয়াল, মামলা হয় চুনোপুঁটির নামে। প্রশাসন দেখেও দেখে না। নির্বিকার প্রশাসন আর বালুখেকো সিন্ডিকেটের ফাঁদে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে হাওরের নদী পাড়ের চাষিরা। ফসলি জমি নদী গর্বে বিলীন হয়, বিপাকে পড়ে কৃষকরা। বর্ষা শেষে হাওরের পানি শুকালেই বালু উত্তোলনের চিত্র ফুঁটে উঠে। তবুও প্রমাণের অভাবে ন্যায়বিচার হারায় কৃষকেরা।
এই ব্যাপারে বাজিতপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারশিদ বিন এনামের সাথে কথা হলে বাজিতপুর বাজারের দক্ষিণে বালু ভরাটের বিষয়ে তার দৃষ্টি গোচর হলেও কোনো অভিযোগ নেই বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ফসলি জমি এবং শ্রেণী পরিবর্তনের বিষয়ে কথা হলে উল্টো তিনি নিচু জায়গা বা গর্ত ভরাট করা হচ্ছে যুক্তি দেখান। তবে কৃষি জমির ক্ষেত্রে কর্তনের বিষয়ে অভিযোগ পেলে দেখবেন বলেও উল্লেখ করেন। এক পর্যায়ে অর্থনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে পুকুর ভরাট এমনকি বালু বিক্রির সুযোগ করে দিচ্ছেন আপনি আর আপনাকে টাকা না দিলে এ সব ড্রেজার ডুকতে দেননি এমন প্রশ্ন করা হলে জবাবে একথাটি সঠিক নয় বলে উল্লেখ করেন।
এছাড়াও উল্লেখ করেন সাম্প্রতিক ভৈরব এলাকার একটি বালু মহল থেকে এ সব বালু এনে আনলোডের মাধ্যমে বিক্রি করে চলেছেন ঐ এলাকায়। তবে বাজিতপুরের কোথাও থেকে বালু তোলা হয়নি বলেও দাবি করেন।
নিকলী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রতীক দত্তের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে, গতকালও পুকুর ভরাটের কারণে তিনি গুরই ইউনিয়নে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন বলে জানান। নিকলীতে যোগদানের পর থেকে এ পর্যন্ত এসব অনিয়মের কারণে প্রায় ৮ লক্ষ টাকার জরিমানা করেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়াও যেখানেই তিনি অভিযোগ পান সেখানেই চলে যান। ১৯৯৫ সালের পরিবেশ অধিদপ্তর সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী কোনো অবস্থাতেই পুকুর, খাল-বিল ও হাওর-বাওর ভরাট করা যাবে না। এমন কথাও তিনি স্পষ্ট বাক্যে উল্লেখ করেন।
নিকলী উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা রেহানা মজুমদার মুক্তির সাথে কথা বলার লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে ২৫ ও ২৬ আগষ্ট বেলা ৩ ও ৪ টার কাছাকাছিতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক ফৌজিয়া খানের সাথে কথা বলার লক্ষ্যে ২৫ আগষ্ট একাধিকবার সরকারি মুঠোফোনে ফোন করা হলে এক পর্যায়ে রাতে অন্য একজন ফোন রিসিভ করে ডিসি মহোদয় চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানান। এমনকি ২৬ আগষ্ট বিকালেও তাকে পাওয়া যায়নি।