নিজেস্ব প্রতিবেদকঃ বালু খেকোদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার দিলালপুরের নদীতীর এলাকা। চোখ মেললেই ধরা পড়ে দিলালপুর বাজারের উপর দিয়ে মোটা পাইপের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত বালু উত্তোলনের দৃশ্য। লাখ লাখ ঘনফুট বালি বাজারের পূর্ব দিকেও লোহার মোটা পাইপের মাধ্যমে নিয়মিত আনলোড করা হচ্ছে। বাজারের উত্তর দিকে ব্রীজ সংলগ্নে দীর্ঘদিন ধরে বিশাল বালির স্তূপ। বিভিন্ন স্থান থেকে উত্তোলন পরবতী জমাকৃত এ সব বালি বিক্রি করে থাকে আশেপাশের এলাকাসহ দূরদূরান্তে। স্থানীয়দের ভাষ্য এমনটি দৃশ্যমান হলেও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা রহস্যজনক।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে উন্নয়নমূলক কাজের অজুহাতে অগুনিত ঘনফুট বালি অবৈধ ড্রেজারের সাহায্যে স্টিলের বড় সাইজের নৌকার মাধ্যমে রাতের আঁধারে নদীর বুক থেকে উত্তোলনের সুযোগ তৈরি করে নেয় উত্তোলন কাজে জড়িতদের মাধ্যমে নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী অসাধু রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা। ওরা ম্যানেজ করে নেয় স্থানীয় প্রশাসনকেও। যে কারণে স্থানীয়দের প্রতিবাদের ভাষ্য প্রভাবশালী বালু খেকোদের ভয়ে চাপা পড়ে। বাধা দিলে রাজনৈতিক এবং সামাজিকভাবে জনসাধারণকে হয়রানির শিকার হতে হয়। এই কারণে সচরাচর বাধা দেয়ারও সাহস দেখায় না বলে উল্লেখ করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা। এ সুযোগে বালু খেকোদের দৌরাত্ম্য অধিক পরিমাণে বেড়ে চলেছে। ক্ষতির মোহে পড়ছে নদীতীর সংলগ্ন ভূমি ও বসতভিটা। অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের ফলেই ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি দেখা দেয়। এই বিষয়ে সুশিলদের ভাষ্য, যদি ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিয়ম মোতাবেক নদীর বুক থেকে বালু উত্তোলন করা হতো তাহলে একদিকে নদীর নাব্যতা ঠিক থাকতো অপরদিকে বড় আকৃতির কার্গো চলাচলের পথেও বাধার সৃষ্টি হতো না। এর ফলে সরকারও বালি বিক্রি করে লাভবান হতে পারতেন। তাছাড়া উন্নয়নমূলক কাজেরও যোগান ঠিক মতো অব্যাহত থাকতো। সাধারণ জনগণও ন্যায্যমূল্যে প্রয়োজনীয় কাজের জন্যে সহজে বালি সংগ্রহ করতে পারতেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বালি বিক্রেতা অনেকটা ক্ষোভের ভাষায় উল্লেখ করেন, সরকারিভাবে বালি-মাটি উত্তোলনে বাধা দেয়া হয় বলেই প্রশাসন ম্যানেজ করে নদীর বুক থেকে বালি তোলা হয় রাতের আঁধারে। এ সব বালি সকালের দিকে স্টিলের বোট থেকে মেশিনের সাহায্যে পাইপের মাধ্যমে নামানো হয়। এ সব কি অগোচরে হচ্ছে! বালু তোলার ক্ষেত্রে এলাকার নেতা ও আইনের লোকদের ম্যানেজ করতে হয় বলেই বেশি দামে এ সব বালি মাটি বিক্রি করতে হয়। উল্টো জবাবে তিনি প্রশ্ন রাখেন ‘সরকার যদি একেবারে বালি তোলা বন্ধ করে দেয় তাহলে জনগণ এবং সরকারের কাজ করবে কি দিয়ে?’ সরকারিভাবে আমাদের এলাকার নদীর চর থেকে বালু তোলার পরে যদি বিক্রি করতো তাহলে সব ঠিক থাকতো আর সরকারও লাভবান হতো। এখনতো পেট ভরে নেতা আর প্রসাশনের!
অনুসন্ধানে জানা গেছে সিলেটের উত্তর পূর্ব সিমান্তের বৃহৎ একটি নদী সুরমা। যা উজানের ভারত থেকে নেমে এসেছে বাংলাদেশে। জকিগঞ্জের বরাক মোহনায় এর উৎপত্তি। সেখান থেকে বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়েছে দুটি ভাগে একটি সুরমা অপরটি কুশিয়ারা। সুরমা নদীটি সুনামগঞ্জ থেকে সোজা দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে নেত্রকোনা জেলার কালিয়াজুড়ি হয়ে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলায় প্রবেশের পর প্রবাহিত হয়েছে ধনু নদী নামে। এটি মিঠামইন ও নিকলীতে এসে ঘোড়াউত্রা নাম ধারণ করে বাজিতপুরের দিলালপুরের কালি নদী হয়ে কুলিয়ারচরের সীমানা অতিক্রম করে ভৈরর সীমান্তবর্তী মেঘনায় গিয়ে পতিত হয়েছে। ঘোড়াউত্রার শাখাও কালি নদীর বুক থেকেই তোলা হচ্ছে এসব বালি। প্রকাশ্যে বালি উত্তোলনের দৃশ্যে স্থানীয়দের আফসোসের ভাষ্য: প্রশাসনকে বলে লাভ হয় না বরং স্থানীয় শত্রুতা বেড়ে যায়। যা পরবর্তীতে ক্ষতি হয়।
স্থানীয়দের দেয়া তথ্যমতে, দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ সময়ের ব্যবধানে আ’লীগ স্থানীয় নেতাকর্মীরা বালি উত্তোলন করে কোটিপতি বনে গেলেও এবার স্থানীয় বিএনপি ও বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা এর সাথে জড়িত বলে স্থানীয়রা জানান।
বাজিতপুর উপজেলা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা দাবিদার তানজিদ হোসেন শুভ্রর সাথে কথা হলে তিনি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারের নামে নয় বরং ব্যক্তিগতভাবে এই বালির ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আলগির চর কিনে নিয়ে আসার কথা জানান। এলোমেলো ঠিকানায় এমনটি উল্লেখ করেন। তবে রাতে নদী থেকে বালু তোলেন এমনটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। স্থানীয় ওসি এবং ইউএনওর সাথে কথা বলেই কাগজ পত্র ঠিক করে তিনি এ বালি ব্যবস্থা করছেন বলেও এক পর্যায়ে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি হিলচিয়ার তোফাজ্জলসহ বাকী বেশ কয়েকজনের এই ব্যবসার কাগজপত্র ঠিক নেই বলে উঠে যেতে হয়েছে এমনটিও স্পষ্টভাবে তোলে ধরেন।
বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনিরের সাথে দিলালপুরে বালি উত্তোলনের হিড়িক বিষয়ে কথা বলা হলে তিনি নিজে এ সবে জড়িত নন বলে দাবি করেন। এমনকি যারা বালু নিয়মিত আনলোড করে চলেছেন তারা রায়পুরা থেকে কিনে নিয়ে এসে আনলোড করে বলে উল্লেখ করেন।
দিলালপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সবুজ মিয়া বলেন, ঘটনাস্থলে ইউএনও এবং আমি বর্তমানে অবস্থান করছি। আজ ১৬ জানুয়ারি বিকালে বালি আনলোড হতে দেখা যাচ্ছে এটা সত্য। তবে কোথা থেকে কে নিয়ে এসেছে তা তার জানা নেই। দীর্ঘদিন থেকেই এমনটি হচ্ছে জবাবে আগে জানতেন না বলেও দাবি করেন। বাধা এবং কাগজ বিষয়ে বৈধ-অবৈধ বিষয়টি তার এখতিয়ারে নেই বলেও উল্লেখ করেন।
বাজিতপুর উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা ফারাশিদ বিন এনাম বলেন, তার জানামতে বাজিতপুরের কোথাও বালু উত্তোলন হয়নি। এমনকি তোলার দৃশ্য কগনো চোখেও পড়েনি। তবে সুনির্দিষ্টভাবে ঘটনার বিবরণ দেয়া হলে তিনি জেলা পর্যায় থেকে নির্দেশনা আছে বুটে করে বালি মহাল থেকে কেউ নিয়ে আসলে আর এসবের সঠিক কাগজ থাকলে এক্ষেত্রে বিক্রি করতে পারবেন। জেলার কোথাও বালু মহাল নেই স্বীকার করলেও উপজেলা প্রসাশন ম্যানেজ করে অবৈধ উপায়ে রাতের আঁধারে বালু তোলার পরে দিনের বেলায় প্রকাশ্যে আনলোড করার বিষয়টি সম্পূর্ণই অস্বীকার করেন।
কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফৌজিয়া খানের কাছে জানতে চাওয়ার জবাবে কিশোরগঞ্জের কোথাও বালি মহল নেই বলে স্বীকার করেন। তবে বাজিতপুর উপজেলার দিলালপুরের বালি উত্তোলন বিষয়ে ইউএনওর কাছে খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলেও জানান তিনি।