বিশেষ প্রতিনিধিঃ বাজিতপুর উপজেলারকে বালি খেকোদের অভয়ারণ্যে পরিণত করার মূল হোতা হিসেবে স্থানীয়রা উপজেলা প্রশাসনকেই দায়ী করেছেন।
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলা প্রসাশনের প্রধান আলোচিত উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা ফারাশিদ বিন এনামকেই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বালি উত্তোলনে অন্যতম দায়ী বলে অভিহিত করেছেন। এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানান অনিয়মে জড়িত থাকার পাশাপাশি এবার সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে টাকার বিনিময়ে শ্রেণী পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার বিষয়েও। অবৈধ সুবিধা নিতেই তিনি নানান উপায়ে গড়ে তোলেছেন একটি শক্তিশালী বলয় ও কৌশলগত নেটওয়ার্ক। সেই বলয়ে সুকৌশলে অর্থনৈতিক লাভের মোহে আবদ্ধ করে নিয়েছেন স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের কয়েকজনকে। যারা নিয়মিত সোস্যাল মিডিয়াতেও অযৌক্তিক সাফাই গেয়ে চলেছেন ইউএনওর পক্ষে। পাশাপাশি শীর্ষ স্থানীয় ক্ষমতাধর নেতাকর্মীদের একটি একাংশকেও অর্থনৈতিক সুবিধার মোহে তিনি আঁতাত করে নিয়েছেন। এছাড়াও গুঞ্জন উঠেছে তার কাছে নীতি নৈতিকতা এবং দলমতের কোনো বালাই নেই বরং টাকা দিলেই যে কোনো দলের লোকজনকেই নিয়ম বহির্ভূত সুবিধা প্রদান করে থাকে। চোখ মেললেই ধরা পড়ছে সারি সারি বালি বোঝাই নৌকা। এ সবেও মিলছে অনিয়মের দৃশ্য।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে শুধু পুকুর ও খাল নয় বরং ঘোড়াউত্রার শাখার হিলোচিয়া বাজার সংলগ্ন ব্রীজের কিছু অংশে বালি দিয়ে ভরাট করে চলেছেন স্থানীয় ক্ষমতাধরদের একাংশকে আঁতাত করে উপজেলা আওয়ামীলীগ নেতা ঝন্টু কুমার সাহা। ঝন্টু শাহা দীর্ঘদিন থেকেই শ্রেণী পরিবর্তনে আর বালিমাটি ভরাট কার্যক্রমে জড়িত। ঝন্টু সাহার পরিচয় তিনি বাজিতপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি। তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও পাওয়া যায়নি। জানা গেছে আনুমানিক ১কোটি ২০ লক্ষ ঘনফুট বালি আনলোড করা হয়েছে শুধু হিলোচিয়া ইউনিয়ন থেকেই। সেখানকার প্রতি ঘনফুট বালি থেকে ৫০ পয়সা করে নিয়েছেন উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা।
বড়মাই পাড়ার ড্রেজার মালিক মিন্টু মিয়া সত্যতা স্বীকার করে বলেন, উপজেলা প্রসাশনকে টাকা দিয়েই তিনি বালি আনলোড করে থাকেন। এছাড়াও পুকুর ভরাট থেকে শুরু করে অনিয়মকে যেভাবে নিয়মে পরিণত করে থাকেন সরল বাক্যে ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে তাও স্বীকার করেছেন। এই সকল ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল।
৬৫ উর্দ্ধ হিলোচিয়া পূর্ব পাড়ার নুরু মিয়া তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, অসংখ্য মাছের পুকুর ভরাট করে চলেছে ড্রেজারের মাধ্যমে বালিমাটি ফেলে।
প্রয়াত হাওয়ালদার মেজর নুর উদ্দিনের ছেলে জুলফিকার আহমেদ মারবিন নিজেকে কিশোরগঞ্জ জেলা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার পরিষদের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও বাজিতপুর উপজেলা যুবদলের সদস্য পরিচয় দিয়ে বলেন, আমার পুকুরের সংলগ্ন অপর একটি পুকুরে বালিমাটি ভরাট করার কারণে কাদা পানিতে আমার পুকুরের অবস্থা নাজেহাল। এমন অসংখ্য পুকুরের অবস্থা এমন হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে কি না? এমন প্রশ্ন রাখতেই তিনি ক্ষোভের ভাষায় উল্লেখ করেন “রক্ষক যে পরিবেশে ভক্ষক সেজে আছে সেই পরিবেশে কার কাছে বিচার দিবো”! আপনারাতো নিশ্চয়ই শুনেছেন ইউএন মহোদয় নিজেই ৫০ পয়সা করে নিচ্ছে প্রতি ঘনফুট বালি থেকে। তার কাছে বিচার দিয়ে লাভ কি!
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে হিলোচিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন অংশ থেকে ৬০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বাজিতপুর বাশমহলের কাছাকাছি হাওরের ফসলি জমিতে এমনকি কৈলাগ, দিলালপুর এবং সাহাপুরসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নিয়ম বহির্ভূতভাবে বালিমাটি ভরাটের বিনিময়ে উপজেলা প্রশাসন কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন অসাধু উপায়ে। সেই সাথে সুবিধা নিচ্ছেন অসাধু স্থানীয় নেতাকর্মীরাও।
হিলোচিয়া বাজার কমিটির আহ্বায়ক ও গুরই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এবং সাবেক গুরই ইউপি চেয়ারম্যান আবু তাহেরসহ অনেকেই মুঠোফোনে জানান, বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে হিলোচিয়াসহ বাজিতপুর এলাকার একাধিক স্থানে ব্যাপক গ্রুপিং চলছে। গ্রুপিংয়ের শীর্ষ পর্যায়ে বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনিরের নামও তারা উল্লেখ করেন। এছাড়াও ইউনিয়ন বিএনপির আরো কিছু অসাধু নেতাকর্মীদের নাম শোনা যাচ্ছে তাদের মুখে। এই নিয়ে যে কোনো মুহূর্তে নিকলী সদরের বালি উত্তোলনের সংঘর্ষের ন্যায় বাজিতপুরেও বড় ধরনের সংঘর্ষের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন। বালি উত্তোলনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন থেকেই এলাকায় আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। যে কোনো সময় বড় ধরণের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটতে পারে বলেও স্থানীয় এলাকাবাসী মনে করছেন।
এই বিষয়ে ইউএনও ফারাশিদ বিন এনামকে একাধিকবার মুঠোফোনে ফোন করেও পাওয়া যায়নি। তবে জেলা প্রশাসক ফৌজিয়া খানের সাথে গত ১৬ সেপ্টেম্বর দুপুরের দিকে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলেও জানান।