নিজেস্ব প্রতিবেদকঃ কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরসহ একাধিক স্থানে চলে অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম। পরিবেশ অধিদপ্তরের কিশোরগঞ্জ শাখার দেয়া তথ্যমতে, ১১৩টি ইটার মধ্যে ৩৭টি ইটভাটাই অবৈধ। যদিও এ তথ্যেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একাধিক সূত্রে জানা গেছে মোট ইটভাটার সংখ্যাও অধিক আর অবৈধ উপায়ে চলছে এমন ইটভাটার সংখ্যাও অনেক বেশি।
চোখ মেললেই ধরা পড়ে ফলসি জমির উপরে, জনবহুল রাস্তার পাশে, গাঁ ঘেষে, মাছের অভয়ারণ্য ঘেঁষে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছিতে প্রায় সব ক’টি ইটভাটা। প্রভাবশালীদের এই সকল ইটভাটা প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলে। এমন অভিযোগ সচেতন মহলের। তবে বাজিতপুর উপজেলা প্রশাসনের নিবার্হী কর্মকর্তার ভাষ্য, এটা পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। সকল তথ্যই তাদের কাছে রয়েছে। উপজেলা প্রসাশনকে ম্যানজ করে চলে অবৈধ ইটভাটা এই ধারণা ভ্রান্ত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মহাসড়কের সাথে সংযুক্ত মূল রাস্তার পাশে এই সব ইটভাটাগুলো দীর্ঘদিন থেকেই পরিবেশ দূষণ করে চলেছে। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতা থাকাকালীন সময়ে এই সকল ইটভাটার অধিক পরিমাণে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি ক্ষমতাধর নেতাকর্মীদেরকেও ম্যানেজ করে উন্নয়নমূলক কাজের অজুহাতে আর কৌশলে দিব্যি চালিয়ে থাকে তাদের এই সব ইটভাটা।
এতে করে স্থানীয় পর্যায়ে কোমলমতি শিশুদের উপরে যেমনিভাবে প্রভাব পড়ছে, তেমনিভাবে জনগণের শ্বাস কষ্টজনীত রোগের পাশাপাশি চুলকানি এবং একজিমার পরিমাণও তুলনামূলক বেড়ে চলেছে। অভিমত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের।
পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মানুযায়ী ফসলি জমির উপর ইটভাটা স্থাপনের নিয়ম না থাকলেও তুলনামূলক উচু শ্রেণীর ফসলি জমিতেই অবস্থিত এসব ইটভাটা। এছাড়াও গাঁয়ের পাশে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অবস্থানে থাকলেও নেই কোনো ধরণের নিষেধাজ্ঞা। অনিয়মকেই যেনো যুগ যুগ ধরে নিয়মে পরিণত করে নিয়েছে মালিক পক্ষ।
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বাজিতপুরে মোট ইটভাটা ১৫টি হলেও স্থানীয় প্রশাসনের দাবি অনেকাংশে কম। সাম্প্রতিক যেখানে সব ধরণের ঝিকঝাক ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ রয়েছে। সেখানে হিলোচিয়া ইউনিয়নের মইতপুর এলাকার রাস্তা সংলগ্নের ফসলি জমিতে ২০২৪ সালের শেষের দিকেও স্থাপন করে কার্যক্রম চলমান রেখেছে নতুন ঝিকঝাক ইটভাটা।
এছাড়াও নিকলী সদরের কুর্শা এলাকার একই পরিবারের অধীনে ৪টি ইটভাটার মধ্যে নিকলীতে মেসার্স আলতাফ ব্রিক এবং সামিহা ব্রিক ফিল্ডকে কয়েক মাস আগেও ঘুরিয়ে দেয় পরিবেশের অধিদপ্তরের নির্দেশে প্রশাসন কর্তৃপক্ষ। তবে আলতাফ ব্রিক ফিল্ড সপ্তাহের ব্যবধানেই পুনরায় তা চালু করে নেয়। একই পরিবারের কামাল ব্রিকের বিষয়েও আইনি প্রক্রিয়া চলমান বলে জানান পরিবেশ অধিদপ্তর। তাছাড়াও নিকলীর উপজেলার কাছাকাছি অবস্থানে ফসলি জমিও মুল রাস্তার পাশে কটিয়াদী উপজেলার করগাঁওয়ের কান্দালিয়াতেও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে একই পরিবারেরই অভিযুক্ত শাপলা ব্রিক ফিল্ড।
পরিবেশ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যমতে, ফিক্সড চিমনি এবং ড্যাম চিমনির পরবর্তী পর্যায়ে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের সবকটি ঝিকঝাক ইটভাটাও বন্ধের নির্দেশ রয়েছে। এতদ্বসত্ত্বেও অনেকেই আইনের ফাঁকফোকরে আদালতে রিটের দোহাইয়ে চালিয়ে যাচ্ছে কার্যক্রম। অবৈধ অনেক ইটভাটায় চলে লাকড়ি ও নিম্নমানের কয়লার ব্যবহার। যে কারণে চুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়া ও এসবের ক্ষতিকর গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে দেয়। এ সব অবৈধ ইটভাটায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিরও যথেষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হয়। এর ধোঁয়া সরাসরি পরিবেশে ছড়িয়ে বলে মানবদেহে এমনকি পরিবেশের অনেক কিছুতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে থাকে।
সচেতন মহলের ভাষ্যমতে, ইলেক্ট্রিক পদ্ধতিতে ইটভাটা স্থাপনের পাশাপাশি ব্লকের ব্যবহার হলে পরিবেশ দূষণ অনেকাংশে কমে আসবে।
বাজিতপুর উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি ও উলাইয়া ব্রিক ফিল্ডের মালিক হাবিব খানের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি ৪বছর যাবৎ সভাপতি পদে বহাল উল্লেখ করে বলেন, বাজিতপুরে ৮টি ইটভাটা রয়েছে। সকল প্রকারের আইন মেনেই চলছে এসব ইটভাটার কার্যক্রম।
বাজিতপুর ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুল হক বকুল জানান, বাজিতপুরে মোট ১২টি ইটভাটা থাকলেও তার জানামতে, ২টি ইটভাটার পরিপূর্ণ বৈধতা রয়েছে। এরি মধ্যে তার হক ব্রিক এবং সভাপতির উলাইয়া ব্রিক। বাকীদের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দেখারও ইঙ্গিত করেন।
কিশোরগঞ্জ জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি খালেকুজ্জামানের ব্যক্তিগত ০১৭১২৫২৬২৩৬ নাম্বারে ২২,সেপ্টেম্বর দুপুরে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
বাজিতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাশিদ বিন এনামের সাথে গত ২১ সেপ্টেম্বর এই বিষয়ে কথা হলে তার অধীনস্থ উপজেলায় মোট ৮টি ইটাভাটা পরিচালিত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন। এছাড়া ইটভাটার সংখ্যা অধিক এবং উপজেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই সব অবৈধ ইটভাটা কার্যক্রম চলমান রয়েছে উল্লেখ করায় খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলেও জানান। এক পর্যায়ে দায় এড়িয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলাতে যোগাযোগের পরামর্শ প্রদান করেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর কিশোরগঞ্জ জেলার কসহকারী পরিচালক মমিন ভুঁইয়ার সাথে কথা হলে জেলায় মোট ১১৩টি ইটভাটার কথা উল্লেখ করেন। তবে এরি মধ্যে ৩৭টি ইটভাটাই অবৈধ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জেলা সিভিল সার্জন ডা.অভিজিত শর্ম্মা ইটভাটার কালো ধোঁয়ার কুফল সম্পর্কে বলেন, এর ফলে শ্বাসতন্ত্রের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ঘন ঘন শ্বাসনালীতে ইনফেকশন দেখা দেয়, শ্বাসকষ্টজনিত রোগের পাশাপাশি দীর্ঘদিন এই অবস্থা বিরাজ করলে এক কথায় বলা চলে ক্যান্সারে আক্রান্তের ঝুঁকি বেশি থাকে।