বিশেষ
প্রতিবেদনঃ হাওরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার বলে খ্যাত নিকলী-বাজিতপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এই এলাকায় স্বাধীনতা পূর্ববর্তী পাকিস্তানী গভর্নর থেকে শুরু করে অসংখ্য খ্যাতিমান দেশ বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের জন্ম। এছাড়াও বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ শিল্পীপতিসহ অসংখ্য শিল্পপতি এবং জ্ঞানী-গুনিরও জন্ম এই এলাকাতেই। পর্যটন নিকলী একটি প্রাচীন জনপদের সুপরিচিত নাম। ১৮৬৯ সালে বাজিতপুরের প্রাচীন এই পৌরসভায় জন্মগ্রহণ করেন এক সময়ের শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যক্তিও। যিনি নিজ উদ্যোগেই গড়ে তোলেন উপমহাদেশের এক সময়ের সেরা রেজাল্টের অধিকারী সেই জহিরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।
রাজনীতিক আলোচনা-পর্যালোচনায় উঠে আসে স্বাধীনতা পরবর্তী কিশোরগঞ্জ-৫, নিকলী-বাজিতপুর সংসদীয় আসনটি ছিলো দীর্ঘদিনের বিএনপির ঘাঁটি। বিএনপির দলীয় অন্তকোন্দলের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নানাবিধ কারণে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০০৮ সালের অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসে। পরবর্তীতে ফ্যাসিবাদী কৌশলে ২০১৪ পরবর্তীতে আ’লীগের ঘাঁটিতে পরিণত করে নিলেও গত ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার গন অভ্যুত্থানের পরে তাদের কার্যক্রম না থাকায় রাজনীতির মেরুকরণ এখানে ব্যতিক্রমী রূপে পরিণত হয়ে উঠেছে। দলীয় কোন্দল না থাকলে বিএনপির বিজয় অনেকটাই সুনিশ্চিত।
বাজিতপুরে ১১টি ইউনিয়ন, ১টি পৌরসভা ও নিকলী উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন-১৬৬। নিকলী-বাজিতপুর উপজেলার নির্বাচন অফিসের সর্বশেষ তথ্যমতে, বাজিতপুর উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ১লাখ ৯৪ হাজার ৬৯০ জন আর নিকলীতে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৭ জন। এ আসনে সর্বমোট ভোটার ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৬৭ জন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বাজিতপুর ও নিকলী উপজেলার সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে চলছে ভিন্ন কৌশলে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। মনোনয়ন প্রত্যাশীদেরও ঘণ ঘণ আসতে দেখা গেছে এলাকায়। তবে এখনো অনেকের মাঝে দ্বিধা ও সংশয় কাজ করছে বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে আদৌও নির্বাচন হবে কি-না? তাছাড়াও সর্বস্তরে পিআর পদ্ধতি কার্যকর হবে কি-না এই বিষয়েও সন্দেহ পোষণ করে চলেছেন। এছাড়াও নিকলী-বাজিতপুরের সর্বস্তরের সকল মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়ে উঠেছে কে পাবে ধানের শীষ প্রতিক। জোটের শরিকদের কেউ, নাকি বিএনপির নেতাদের কেউ। এদের মাঝে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে কেন্দ্রীয় নিবার্হী কমিটির সদস্য ও বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল এবং বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদাকে ঘিরে। সৈয়দ এহসানুল হুদার বাড়িও বাজিতপুরেই। ইকবাল হোসেনকে ঘিরে আলোচনা রয়েছে তিনি বিগত ফেসিবাদী আমলেও মনোনয়ন পেয়েছেন। দুঃসময়ে কর্মীদের খোঁজখবর নিয়েছেন। স্বজনদের দৌড়ঝাঁপও রয়েছে উপর মহলে। তাই তার সমর্থকদের দৃঢ় বিশ্বাস তিনিই মনোনয়ন পাবেন। ধানের শীষের মনোনয়ন পাওয়া মানেই সংসদ সদস্য বনে যাওয়া। তবে ইকবালের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে ব্যাপক সমালোচনাও রয়েছে তৃণমূলে। অপরদিকে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে সৈয়দ এহসানুল হুদাকে নানাভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। কেন্দ্রীয় চিঠিসহ তার পক্ষে নিকলী বাজিতপুরের নেতাকর্মীদেরকে সহযোগিতা করারও বিষয়েও মনোনয়নের ইঙ্গিত মিলেছে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে চলেছেন তার সমর্থকরা। এছাড়াও গুঞ্জন রয়েছে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুনজর রয়েছে তার দিকে। তিনি কারা নির্যাতিত একজন ত্যাগী নেতা। মনোনয়ন পেলে সাধারণ মানুষ মন খোলে কথা বলার সুযোগ পাবে বলেও তার সমর্থকরা উল্লেখ করেন। এছাড়াও সমালোচনা রয়েছে এলাকার বাহিরে থাকায় কর্মী সমর্থকদের সংখ্যা তুলনামূলক অনেকাংশে তার কম।
রাজনৈতিক পর্যালোচনায় উঠে আসে ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনজুর আহমদ বাচ্চু মিয়া আওয়ামী লীগের টিকেটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। প্রতিদ্বন্দ্বী আমির উদ্দিন আহমেদ (সতন্ত্র)।
১৯৭৯ সালে বিএনপি থেকে প্রয়াত আমার উদ্দিন আহমেদ সংসদ নির্বাচিত হলে প্রতিদ্বন্দ্বী আ’লীগের প্রয়াত এ্যাডভোকেট আঃ লতিফ। ১৯৮৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন প্রয়াত খালেকুজ্জামান হুমায়ূন (মুসলিম লীগ) প্রতিদ্বন্দ্বী প্রয়াত মোজাম্মেল হক ১৪ দল (ন্যাপ-মোজাফ্ফর)। ১৯৮৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন প্রয়াত মফিজুর রহমান রোকন তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রয়াত এ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম (জাতীয় পার্টি)। ১৯৯১ সালে প্রয়াত আমির উদ্দিন আহমেদ (বিএনপি) আর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন প্রয়াত এডভোকেট আঃ লতিফ (আ’লীগ)। ১৯৯৬ সালে দুটি নির্বাচন হয় প্রথমে বিনা প্রতিদ্বীতায় বিএনপি থেকে সংসদ হন প্রয়াত আমির উদ্দিন আহমেদ আর দ্বিতীয়বারের মতো ১৯৯৬ সালে নির্বাচন হন প্রয়াত মজিবুর রহমান মঞ্জু আর প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন আলাউল হক (আ’লীগ)। ২০০১ সালে বিএনপি থেকে প্রয়াত মজিবুর রহমান মঞ্জু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আর প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আফজাল হোসেন আবারো সংসদ সদস্য নির্বাচিতের পাশাপাশি ২০১৮ সালের অনুষ্ঠিত পাতানো নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে টানা তিন বারের মত আ’লীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মো. আফজাল হোসেন।
সাম্প্রতিক সেখানকার ভোটার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর প্রয়াত আবদুল মোনায়েম খানের বাড়ি বাজিতপুরে বলে মুসলিম লীগের তথা ডানপন্থীদেরও বড় একটি সমর্থক শ্রেণী রয়েছে সেখানে। যে কারণে বেশির ভাগ সময় এ আসনটি ফ্যাসিবাদী বিরোধীদের’ দখলে থেকেছে। বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী অন্য নেতারা হলেন বাজিতপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র এহেসান কুফিয়া, ইতালি প্রবাসী বদরুল আলম শিপু, বাজিতপুর বিএনপি নেতা জি.এস.মীর জলিল ও বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মামুন। উল্লেখ্য মামুনের পিতা প্রয়াত মজিবুর রহমান মঞ্জু দুইবারের বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য ছিলেন। নিকলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট বদরুল মোমেন মিঠু। উল্লেখ্য মিঠুর পিতাও প্রয়াত আমির উদ্দিনও তিনবারের সংসদ সদস্য ছিলেন। তবে ১৯৯৬ সালে মনোনয়ন বঞ্চিত হলে দলের বিতর্কিত অবস্থানে চলে যান। পরবর্তীতে এডিপিতেও যোগদান করেন। এছাড়াও সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক শফিকুল আলম রাজনসহ কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সহসাধারণ সম্পাদক ও নিকলী উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি মাসুক মিয়ার নামও শোনা যাচ্ছে। তাছাড়াও প্রচার প্রচারণা থেকে শুরু করে নানাবিধ কারণে গুরুত্বের সাথে উঠে আসে রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুমের নাম। তার বাড়িও বাজিতপুরেই। তিনিও সংসদ সদস্য পদে নির্বাচী প্রচার প্রচারণায় রয়েছেন দীর্ঘদিন থেকেই। জোটে আসতে পারলেই তারও ভাগ্য বদলে যেতে পারে।
এই দিকে বিএনপির বা শরিক দলের একমাত্র শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হবে বলে আলোচনায় রয়েছে কেন্দ্রীয় মজলিসে সুরা সদস্য ও জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক মো. রমজান আলী। দলমত নির্বিশেষে আলোচনা রয়েছে রমজান ক্লীন একজন ক্লীন ইমেজের রাজনীতিবীদ। জামায়াতে ইসলামী দল থেকে তাঁকে মনোনয়ন আগে থেকেই অনেকটা চূড়ান্ত রয়েছে। তার নির্বাচনী এলাকাতে গণসংযোগও চালিয়ে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরেই। তবে সেক্ষেত্রে বিএনপির অন্তদ্বন্দ্ব বিরাজমান থাকলে জামায়াতে ইসলামীর দলও চমক দেখাতে পারেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। সরেজমিনে তরুণ ও সাধারণ ভোটারদের মতামত জোট হলে ভাগ্য খুলতে পারে ব্যতিক্রমী কারোর।